ধর্ম
দ্বিতীয় বিয়ে করতে লাগবেনা প্রথম স্ত্রীর অনুমতি, কোরআন ও শরিয়ত কী বলে?
ইসলামে একজন পুরুষের জন্য বিশেষ পরিস্থিতিতে একাধিক বিয়ের অনুমতি থাকলেও এর সাথে জুড়ে দেওয়া হয়েছে অত্যন্ত কঠিন শর্ত। বর্তমান সমাজে দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর অনুমতির বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। তবে পবিত্র কুরআনের বিধান এবং শরিয়তের আলোকে এর ব্যাখ্যা অত্যন্ত স্পষ্ট।
পবিত্র কুরআনের নির্দেশনা একাধিক বিয়ের অনুমতি সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন:
তবে তোমরা তোমাদের পছন্দমতো নারীদের মধ্য থেকে দুই, তিন বা চারজনকে বিয়ে করতে পারো। কিন্তু যদি তোমরা আশঙ্কা করো যে (স্ত্রীদের মধ্যে) ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তবে একজনকে (বিয়ে করো)।(সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৩)। এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা একাধিক বিয়ের ক্ষেত্রে 'ন্যায়বিচার' বা সমতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিয়ের জন্য প্রথম স্ত্রীর কাছ থেকে অনুমতি নেওয়া বিয়ের 'বৈধতার' জন্য শর্ত নয়। অর্থাৎ, প্রথম স্ত্রী অনুমতি না দিলেও শরিয়ত অনুযায়ী বিয়ে ভেঙে যায় না। তবে অন্য একটি আয়াতে আল্লাহ সতর্ক করে বলেছেন:
‘তোমরা যতই চেষ্টা করো না কেন, তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে সমান ব্যবহার করতে পারবে না...।’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১২৯)
আল্লাহ তাআলা কোরআনে বলেন, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদেরই মধ্য হতে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের সঙ্গীণীকে, যাতে তোমরা তাদের নিকট শান্তি লাভ করতে পার ও তোমাদের (স্বামী-স্ত্রীর) পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এতে বহু নিদর্শন রয়েছে, সেইসব লোকের জন্য, যারা চিন্তা-ভাবনা করে। (সুরা: রূম, আয়াত ২১)
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, তিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি হতে সৃষ্টি করেছেন। তার থেকেই তার স্ত্রীকে বানিয়েছেন, যাতে সে তার নিকট প্রশান্তি লাভ করতে পারে। (সুরা: আরাফ, আয়াত ১৮৯)
তবে এখানে প্রশ্ন হলো দ্বিতীয় বিয়ের জন্য প্রথম স্ত্রীর অনুমতি কি জরুরি? না জরুরি নয়।
অধিকাংশ ওলামায়ে কেরামের মতে, বিয়ের জন্য প্রথম স্ত্রীর অনুমতি শর্ত না হলেও তাকে জানানো বা তার সাথে পরামর্শ করা একটি উত্তম নৈতিক কাজ। কারণ, লুকোচুরি করে বিয়ে করলে পরবর্তীতে সংসারে অশান্তি ও জুলুম হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আর ইসলামে কারো ওপর জুলুম করা বা কারো হক নষ্ট করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলেও বিয়ে হয়ে যাবে। তবে এক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে, ইসলাম একাধিক বিয়ের অনুমতি তখনি প্রদান করেছে, যখন উভয় স্ত্রীর হক সমানভাবে, কোনো প্রকার বৈষম্য ছাড়া আদায় করতে পারবে, তখন। সাম্যতা বজায় রাখতে না পারলে, কিংবা হক আদায় করতে না পারলে দ্বিতীয় বিবাহ করা জায়েজ নয়।
আইনি প্রেক্ষাপট শরিয়তে অনুমতি বাধ্যতামূলক না হলেও, বাংলাদেশের প্রচলিত মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী প্রথম স্ত্রীর অনুমতি বা সালিশি পরিষদের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করা দণ্ডনীয় অপরাধ। এক্ষেত্রে শরিয়তের মূল স্পিরিট হলো—নারীর অধিকার রক্ষা করা এবং কোনো অবস্থাতেই যেন অবিচার না হয় তা নিশ্চিত করা।
এছাড়াও শরয়ি কারণ পাওয়া গেলে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবে। শরয়ি কারণ হলো, প্রথম স্ত্রী অবাধ্য, শারীরিক সম্পর্ক করতে পারছে না, প্রথম স্ত্রী অনেক অসুস্থ, যার কারণে স্বামীর গুনাহ হওয়ার সম্ভবনা দেখা দেয়, প্রথম স্ত্রী লাগামহীন, তখন অবশ্যই একজন আলেমের শরণাপন্ন হবে।
তার অবস্থা জানাবে, আলেমের পরামর্শ নিয়ে অন্য বিয়ে করবে। আর প্রথম স্ত্রীর কোনো ধরণের সমস্যা না থাকলে, শরয়ি কোনো ওজর না থাকলে তারজন্য একাধিক বিয়ে করা জায়েজই নাই। কারণ প্রথম স্ত্রীর সমস্যা থাকলেই একাধিক বিয়ে করতে পারবে, যদি তাদের প্রতি বৈষম্যহীনভাবে পরিচালনা করতে পারে। এটাই কোরআনের নির্দেশ। প্রথম স্ত্রীর কোনো সমস্যা না থাকলে, তখন দ্বিতীয় বিয়ে করতে গেলেই অশান্তি সৃষ্টি হয়। এখানেই বৈষম্যগুলো দেখা দেয়। এটা কোরআনের নির্দেশ না।
বিয়ে মানবজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জীবনের অপরিহার্য চাহিদা পূরণের জন্য অপরিসীম ভূমিকা রাখে বিয়ে। পরিণয় ছাড়া জীবন অনেক সময় নিষ্ক্রিয় ও অসার হয়ে পড়ে। জীবনের শৃঙ্খলা ও পূর্ণতা আনতে বিয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। সুতরাং, মানবজীবনে বিয়ের গুরুত্ব অপরিসীম এবং এটি সুখী ও সার্থক জীবনের জন্য অত্যাবশ্যক।