সারাদেশ

অপ্রতিম হত্যা: আটক তুহিনের বাড়ি থেকে আইফোন উদ্ধারসহ মিলল আরও যেসব তথ্য


সারাদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৩ পিএম

অপ্রতিম হত্যা: আটক তুহিনের বাড়ি থেকে আইফোন উদ্ধারসহ মিলল আরও যেসব তথ্য
ছবি: সংগৃহীত

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে আটক মো. তুহিনের বাড়ি থেকে অপ্রতিমের মায়ের হারিয়ে যাওয়া আইফোন উদ্ধার করেছে পুলিশ।

শনিবার রাতে পুলিশ গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান জানান, অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তথ্য রোববার দুপুর ১২টার সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা হবে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, সিসিটিভি ফুটেজে অপ্রতিমের সঙ্গে দেখা যাওয়া এক কিশোরের বাড়ি থেকে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা আইফোনটি উদ্ধার করেন। ওই আইফোনটি নিয়ে বের হওয়ার পরই নিখোঁজ হয়েছিল অপ্রতিম।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও উদ্ধার হওয়া আলামত থেকে ধারণা করা হচ্ছে, আইফোনটির জন্যই অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তবে হত্যার উদ্দেশ্য সম্পর্কে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানায়নি।

অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকার বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে। একটি ফুটেজে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের কাছে অপ্রতিমের সঙ্গে এক কিশোরকে দেখা যায়। তার বয়স অপ্রতিমের চেয়ে বেশি ছিল এবং মাথায় ক্যাপ পরা ছিল। পরে কাছাকাছি একটি বাড়ির সিসিটিভি ফুটেজেও ওই কিশোরকে অপ্রতিমকে নিয়ে যেতে দেখা যায়।

পরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে ওই কিশোরের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্যরা তার বাড়িতেও যান। বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর পর শনিবার দুপুরে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পাশাপাশি কোটবাড়ি এলাকা থেকে ওই কিশোরকে আটক করে গোয়েন্দা পুলিশ।

জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হয়। এর ধারাবাহিকতায় শনিবার রাত ৮টার দিকে সালমানপুর এলাকায় তুহিনের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে অপ্রতিমের মায়ের আইফোনটি উদ্ধার করা হয়।

অনুসন্ধানে তুহিনের বিরুদ্ধে টাকা ও মোটরসাইকেল আত্মসাৎ, মাদক এবং কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত বছরের ২৬ এপ্রিল সদর দক্ষিণ মডেল থানায় তার বিরুদ্ধে মোটরসাইকেল আত্মসাতের অভিযোগও করা হয়েছিল।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, সোহাগ নামে এক ব্যক্তির পূর্বপরিচিত ছিলেন তুহিন। গত ২৭ মার্চ সোহাগ কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকার একটি মোটরসাইকেল বিক্রয় প্রতিষ্ঠান থেকে দুই লাখ পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে একটি সুজুকি মোটরসাইকেল কেনেন। পরে তুহিন সেটি নিয়ে যান বলে অভিযোগ করেন সোহাগ।

সোহাগের পরিবারের দাবি, মোটরসাইকেল উদ্ধারের জন্য থানায় গেলে পুলিশ মামলা না নিয়ে সাধারণ ডায়েরি গ্রহণ করে। এ সময় তৎকালীন এক উপপরিদর্শকের বিরুদ্ধে দুই দফায় মোট ৩০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগও করেন তারা। তবে টাকা নেওয়ার পরও মোটরসাইকেল উদ্ধার করে দেওয়া হয়নি বলে দাবি পরিবারের।

অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তুহিনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন সোহাগ। তার দাবি, তুহিন তাকে ডেকে নিয়ে কৌশলে মোটরসাইকেলটি নিয়ে যান। এ ঘটনায় মামলা করতে গেলেও পুলিশ শুধু সাধারণ ডায়েরি গ্রহণ করেছিল।

সোহাগ বলেন, ছোট অপরাধের বিচার না হলে অপরাধীরা পরে আরও বড় অপরাধ করার সাহস পায়। আগের অভিযোগের সময় যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত বলেও দাবি করেন তিনি।

এদিকে স্থানীয় কয়েকজন কিশোরের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোটবাড়ি ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মাদকের সঙ্গে তুহিনের সম্পৃক্ততা ছিল। ২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মাদকসহ আটক হওয়া সাত কিশোরের কয়েকজনের সঙ্গেও তার চলাফেরা ছিল বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। ওই সময় কিশোরদের আটকের ঘটনায় ভারপ্রাপ্ত প্রক্টরের দায়িত্বে ছিলেন অপ্রতিমের মা ড. নাহিদা বেগম।

তুহিনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রম পর্যালোচনা করেও তার পরিচিত কয়েকজনের সঙ্গে অপ্রতিমের পরিচয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের কয়েকজন অপ্রতিমের মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক প্রকাশ করেছেন। তবে এসব পরিচয় বা যোগাযোগের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কিনা, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

তুহিনকে আটকের পর শাহরিয়া আনাস নামে আরও একজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করেছে পুলিশ। আনাসের সঙ্গে তুহিনের যোগসাজশ ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। অপ্রতিমের মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে আনাস অপ্রতিমের সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে শোক প্রকাশ করেন। তিনি দাবি করেন, অপ্রতিম মাঝেমধ্যে তাকে ছবি তোলার জন্য বার্তা দিতেন।

তুহিনের বাড়ির পাশের এক নারীর দাবি, বাড়িতে তুহিন শান্ত থাকলেও বাইরে বিভিন্ন ছেলের সঙ্গে মিশতেন। এর আগে বন্ধুদের টাকা আত্মসাতের অভিযোগও তার বিরুদ্ধে ছিল বলে জানান তিনি। আরেক নারী জানান, বিভিন্ন কারণে তুহিনের বাবা তাকে মারধর করে শাসন করতেন।

এদিকে তুহিনের এক খালা খবর পেয়ে দুপুরে বাড়িতে আসার কথা জানালেও তার আচরণ সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।