সারাদেশ

অপ্রতিম হত্যা: আসামিদের জবানবন্দিতে মিলল যেসব চাঞ্চল্যকর তথ্য


সারাদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৩৭ এএম

অপ্রতিম হত্যা: আসামিদের জবানবন্দিতে মিলল যেসব চাঞ্চল্যকর তথ্য
ছবি: সংগৃহীত

আইফোনের লোভে ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল ঘটনার প্রায় এক সপ্তাহ আগে। ছবি তোলা ও টিকটক ভিডিও তৈরির সূত্রে অপ্রতিমের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল আসামিদের। পরে ছবি তোলার কথা বলে তাকে কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের নির্জন এলাকায় নিয়ে গিয়ে আইফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। একপর্যায়ে কথা কাটাকাটির মধ্যে কোদালের হাতল দিয়ে মাথায় আঘাত করে তাকে হত্যা করা হয়।

কুমিল্লায় অপ্রতিম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার তিন আসামির আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এসব তথ্য উঠে এসেছে। তিন জবানবন্দিতে হত্যার পরিকল্পনা, অপ্রতিমকে পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া, আইফোন নেওয়া এবং হামলার বিষয়ে বেশ কিছু মিল রয়েছে। তবে হত্যার পর কে কোথায় গিয়েছিল এবং ঘটনার কয়েকটি অংশের বর্ণনায় পার্থক্য রয়েছে।

কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র অপ্রতিম ১৮ সেপ্টেম্বর বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয়। পরদিন কুমিল্লা সদর দক্ষিণের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের একটি নির্জন জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই কিশোর ২০ সেপ্টেম্বর রাতে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

তিন জবানবন্দির মধ্যে হত্যার পরিকল্পনা নিয়ে সবচেয়ে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন তুহিন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পাঁচ থেকে ছয় মাস ধরে অপ্রতিমের সঙ্গে তার পরিচয় ছিল। তার বন্ধু সিয়ামের মোটরসাইকেলে করে ছবি তোলা ও টিকটক ভিডিও তৈরির জন্য অপ্রতিম তাদের সঙ্গে বের হতো।

তুহিনের দাবি, অপ্রতিমের আইফোনের প্রতি তার ও অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোর ফাহাদের লোভ হয়। ঘটনার আগের শুক্রবার সন্ধ্যায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে তারা দেখা করে। সেখানেই আইফোন নেওয়া এবং অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।

ফাহাদের জবানবন্দিতেও ওই বৈঠকের কথা এসেছে। তবে হত্যার পরিকল্পনার দায় মূলত তুহিনের ওপর দিয়েছে সে। অপর কিশোর কামরুলের জবানবন্দিতেও বলা হয়েছে, ঘটনার দিন তাকে জানানো হয়েছিল আইফোনের জন্য অপ্রতিমকে হত্যা করা হবে।

তিন জবানবন্দির বর্ণনায় একটি বিষয়ে মিল রয়েছে। তা হলো, অপ্রতিমকে হত্যার সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে নেওয়া হয়নি। আইফোন নেওয়ার উদ্দেশ্যে আগে থেকেই হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে আসামিদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।

তুহিনের জবানবন্দি অনুযায়ী, হত্যার আগের দিন ময়নামতির একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনে অপ্রতিমের সঙ্গে তার দেখা হয়। পরে অপ্রতিম তাকে নিজের টিকটক অ্যাকাউন্টের ঠিকানা দেয়। ওই রাতেই টিকটকের মাধ্যমে তাদের যোগাযোগ হয় এবং পরদিন জুমার নামাজের পর দেখা করার সিদ্ধান্ত হয়।

১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে অপ্রতিমের সঙ্গে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে দেখা হওয়ার কথা জানান তুহিন। এরপর ছবি তোলার কথা বলে তাকে সানন্দা পশ্চিমপাড়ার একটি নির্জন পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়।

অন্যদিকে ফাহাদ জানিয়েছে, দুপুরের পর কোটবাড়ির বোর্ড মার্কেট এলাকায় অপ্রতিমের সঙ্গে তার দেখা হয়। পরে সে তার বন্ধু কামরুলকে নিয়ে পাহাড়ে যায়। সেখানে অপ্রতিম ও তুহিনকে বসে থাকতে দেখে তারা।

পাহাড়ে যাওয়ার পর অপ্রতিমের আইফোন নেওয়া হয়। ফাহাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সে অপ্রতিমের কাছে ফোন চাইলে অপ্রতিম সেটি তাকে দেয়। কিছুক্ষণ ব্যবহারের পর সে ফোনটি তুহিনের হাতে দেয়। এরপর ফোন ফেরত দেওয়াকে কেন্দ্র করে অপ্রতিম ও তুহিনের মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হয়।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অপ্রতিম আইফোনটি ফেরত নেওয়ার চেষ্টা করলে তুহিন বাধা দেয়। এরপর তার ওপর হামলা চালানো হয়।

তিন আসামির জবানবন্দিতে আরও একটি বিষয়ে মিল রয়েছে। অপ্রতিমকে প্রথম আঘাত করে তুহিন। প্রথমে তাকে থাপ্পড় মারা হয়। পরে পাশে পড়ে থাকা কোদালের হাতল দিয়ে তার মাথায় আঘাত করা হয়। এরপর অন্য দুজনকেও মারতে বলা হয়।

ফাহাদ ও কামরুলের জবানবন্দিতেও তুহিনের হাতে কোদালের হাতল দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় প্রথম আঘাত করার কথা উল্লেখ রয়েছে।

অপ্রতিমকে হত্যার উদ্দেশ্য সম্পর্কেও তিন জবানবন্দিতে মিল পাওয়া গেছে। আসামিদের বক্তব্য অনুযায়ী, মূল উদ্দেশ্য ছিল তার আইফোনটি নিয়ে পরে বিক্রি করা। ফাহাদ জানিয়েছে, আইফোন বিক্রি করে পাওয়া টাকা ভাগ করে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কামরুলের বক্তব্যেও আইফোন বিক্রি করে টাকা ভাগ দেওয়ার কথা উঠে এসেছে।

তবে অপ্রতিমের মৃত্যুর পর আসামিরা কে কোথায় গিয়েছিল, সে বিষয়ে জবানবন্দিতে কিছু পার্থক্য রয়েছে। তুহিনের দাবি, অন্য দুজন একদিকে চলে যাওয়ার পর তিনি অন্যদিকে গিয়ে বাসায় ফেরেন। অপর দুই কিশোরের বক্তব্যেও ঘটনাস্থল ছাড়ার বিষয়ে ভিন্নতা রয়েছে। তবে অপ্রতিমের আইফোন শেষ পর্যন্ত তুহিনের কাছে ছিল বলে তিনজনের বক্তব্যেই উঠে এসেছে।

তুহিনের জবানবন্দিতে তার বন্ধু মো. সিয়ামকে নিয়েও তথ্য এসেছে। তার দাবি, হত্যার পর বাসায় ফিরে তিনি সিয়ামকে ফোন করে ডেকে এনে পুরো ঘটনা জানান। সিয়াম হত্যার পরিকল্পনার বিষয়টি আগে থেকেই জানতেন বলেও তুহিনের বক্তব্যে উল্লেখ রয়েছে।

তবে অপর দুই আসামির জবানবন্দিতে হত্যার আগের পরিকল্পনার সঙ্গে সিয়ামের সম্পৃক্ততার কথা নেই। পরে পুলিশ সিয়ামকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। পুলিশের ভাষ্য, তিনি সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেননি, তবে ঘটনার কথা জানার পর তা গোপন করেছিলেন।

ঘটনার পরের দিনের আচরণ নিয়েও আসামিদের জবানবন্দিতে তথ্য রয়েছে। তুহিন জানান, হত্যার পরদিন সকালে অপ্রতিমের মামা তাকে ফোন করে অপ্রতিমের খোঁজ করেন। এরপর তিনি সিয়ামকে নিয়ে কোটবাড়িতে অপ্রতিমের সন্ধানে যান।

ফাহাদও জানিয়েছে, পরদিন সে অপ্রতিমের বাবার একজন সহকারীর সঙ্গে তাকে খুঁজতে বের হয়। পরে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের খবর পেয়ে সে ঘটনাস্থলে যায়। কামরুলের বক্তব্য অনুযায়ী, মরদেহ উদ্ধারের পর সে ও তার বন্ধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপ্রতিমের মৃত্যুতে দুঃখ প্রকাশ করে।

পুলিশ জানিয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে তুহিনকে শনাক্ত করা হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর অন্যদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়। পরে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।