সারাদেশ
মনোহরদীর বিষফোঁড়া কথিত সাংবাদিক শাকিলের অপকর্মে অতিষ্ঠ এলাকাবাসী
নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার কাজী শরিফুল ইসলাম ওরফে শাকিল নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ভুয়া সাংবাদিকতা, চাঁদাবাজি, হুমকি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তার অপকর্মে বিব্রত হয়েছেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক সমাজসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, শাকিল নিজেকে সাংবাদিক পরিচয়ে মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায় করেন। তিনি কোনো স্বীকৃত গণমাধ্যমে কাজ করেন না, বরং ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর ও মানহানিকর পোস্ট দিয়ে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে হয়রানি করেন। অনেকে বলছেন, তার মানসিক ভারসাম্য নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
সম্প্রতি শাকিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মনোহরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এম এ মুহাইমিন আল জিহানকে উদ্দেশ করে “বিদায় ঘণ্টা বেজে গেছে” শিরোনামে একটি পোস্ট দেন। একই সঙ্গে সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল ও তার পরিবারের বিরুদ্ধেও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, ইউএনও তার অবৈধ দাবি পূরণ না করায় তিনি অপপ্রচারে লিপ্ত হন। পূর্বেও বিভিন্ন ইউএনওর বিরুদ্ধে এমন অপপ্রচার চালিয়েছেন তিনি।
মনোহরদী উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব মাসুদুর রহমান সোহাগ ও পৌর যুবদলের আহ্বায়ক আব্দুস সামাদ বকুলসহ একাধিক নেতা অভিযোগ করে বলেন, “শাকিল আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সাবেক শিল্পমন্ত্রীপুত্র মঞ্জুরুল মজিদ মাহমুদ সাদীর ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তার প্রভাব খাটিয়ে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করেছিলেন। সরকার পরিবর্তনের পর বিএনপি ঘেঁষার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে এখন বিএনপি-জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধেও কুৎসা রটাচ্ছেন।”
তারা জানান, শাকিলের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, হুমকি ও অপপ্রচারসহ একাধিক মামলা রয়েছে। এমনকি স্থানীয় যুবকদের হাতে তিনি একাধিকবার গণধোলাইয়েরও শিকার হয়েছেন।
চন্দনবাড়ী ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আবু রায়হান ভূঁইয়া বলেন, “সম্প্রতি শাকিল আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পোস্ট দিয়েছেন। এতে আমার ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে। তিনি মনোহরদীর শিক্ষকদের বিরুদ্ধে নিয়মিত প্রোপাগান্ডা চালিয়ে যাচ্ছেন। আমি বিষয়টি আইনগতভাবে মোকাবিলা করব।”
মনোহরদী কারিগরি কলেজের অধ্যক্ষ মো. সাইফুল ইসলাম জানান, “শাকিল কলেজের পরিচালনা কমিটিতে যুক্ত হতে চেয়েছিলেন। তার দাবি পূরণ না করায় ইউএনও ও আমাকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুৎসা রটাচ্ছেন এবং হুমকি দিচ্ছেন।”
খিদিরপুর ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি আপন ভূঁইয়া বলেন, “আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শাকিল সাবেক শিল্পমন্ত্রীপুত্র সাদীর ভয় দেখিয়ে আমার কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা আদায় করেন। পরে আবার চাঁদা দাবি করলে আমি না দেওয়ায় ফেসবুকে আমার নামে মিথ্যা অপপ্রচার শুরু করেন।”
তিনি আরও বলেন, “মনোহরদীতে অসংখ্য মানুষ তার অপপ্রচারের শিকার। কেউ তার কথামতো না চললেই সে তাদের নামে পোস্ট দিয়ে সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করে।”
স্থানীয় সংবাদকর্মীরা জানিয়েছেন, শাকিলকে তারা কোনো স্বীকৃত সাংবাদিক হিসেবে মানেন না। এক সাংবাদিক বলেন, “তার মতো অপসাংবাদিকের কারণে আমাদের পেশার সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে। তার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালিয়ে অর্থ আদায় করা। কিন্তু পুলিশ তার বিরুদ্ধে নীরব।”
মনোহরদী প্রেসক্লাবের সভাপতি ও পৌর জামায়াতের আমির আসাদুজ্জামান নূর বলেন, “আমি সম্প্রতি একজন সাবেক জেলা প্রশাসকের বোনের মেয়েকে বিয়ে করেছি। অথচ শাকিল ওই বিয়ে নিয়ে মসজিদের মুয়াজ্জিনকে জড়িয়ে কুরুচিপূর্ণ ও মিথ্যা পোস্ট দিয়েছেন। মানুষের সম্মানহানি করাই তার পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কাজী শরিফুল ইসলাম শাকিলের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একাধিক মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ধানমন্ডি থানার মামলা নং ৪ (তারিখ: ২ সেপ্টেম্বর ২০১৫), মনোহরদী থানার মামলা নং ৯/৭৯ (তারিখ: ১২ এপ্রিল ২০২০) এবং মামলা নং ৭/৭৬ (তারিখ: ৮ আগস্ট ২০২২) উল্লেখযোগ্য।
এছাড়া জাতীয় দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন তার বিরুদ্ধে প্রতারক হিসেবে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল বলে জানা গেছে।
যোগাযোগ করা হলে শাকিল নিজেকে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি) থেকে পাশ করা সাংবাদিক দাবি করেন। তবে ব্ল্যাকমেইল ও ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে মানুষকে হয়রানির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি প্রতিবেদকের নম্বর ও হোয়াটসঅ্যাপ উভয়েই ব্লক করে দেন।
মনোহরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এম এ মুহাইমিন আল জিহান বলেন, “শাকিলের বিষয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি। তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”