সারাদেশ

তিন পাতার চুক্তিনামায় লাখ টাকায় শিশু মুসা ‘বিক্রি’, বাবার দাবি নিয়েছিলেন ৫ হাজার


সারাদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২৮ পিএম

তিন পাতার চুক্তিনামায় লাখ টাকায় শিশু মুসা ‘বিক্রি’, বাবার দাবি নিয়েছিলেন ৫ হাজার
ছবি: সংগৃহীত

আইফোন কেনার শখ পূরণ করতে নিজের দেড় বছরের শিশুকে এক লাখ টাকায় বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক বাবার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় তৈরি করা হয়েছে তিন পাতার একটি চুক্তিনামাও। চুক্তিপত্রে শিশুটিকে ‘দত্তক’ দেওয়ার কথা উল্লেখ থাকলেও সেখানে এক লাখ টাকা লেনদেনের বিষয়টি স্পষ্টভাবে লেখা রয়েছে। তবে অভিযুক্ত বাবা দাবি করেছেন, তিনি সন্তান বিক্রি করেননি; বরং লালন-পালনের জন্য অন্য এক ব্যক্তির কাছে শিশুটিকে দিয়েছিলেন এবং মাত্র পাঁচ হাজার টাকা নিয়েছিলেন।

চাঞ্চল্যকর এ ঘটনা ঘটেছে পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার বেতাগী-সানকিপুর ইউনিয়নের বড় গোপালদী গ্রামে। অভিযুক্ত বাবার নাম মো. মারুফ মুন্সি (২২)। তিনি ওই গ্রামের মফিজ মুন্সির ছেলে এবং পেশায় কাঠমিস্ত্রি। অভিযোগ ওঠার পর শিশুটিকে উদ্ধারে অভিযান চালায় পুলিশ। পরে শিশুটির বাবা মারুফ মুন্সিকে আটক করা হয়।

এদিকে শিশুটিকে এক লাখ টাকায় ‘দত্তক’ দেওয়ার একটি চুক্তিপত্র পাওয়া গেছে। চুক্তিপত্রটি তিন পাতার। এতে প্রথম পক্ষ হিসেবে মো. মারুফ (২২) এবং দ্বিতীয় পক্ষ হিসেবে মো. ইমরানের (২৮) নাম উল্লেখ রয়েছে। চুক্তিপত্রে শিশুটির নাম জাহিদুল ইসলাম মুসা এবং তার জন্মতারিখ ১১ মে ২০২৫ উল্লেখ করা হয়েছে।

চুক্তিপত্রে মারুফ লিখেছেন, তার স্ত্রী অবাধ্য হয়ে তাকে না জানিয়ে অজানার উদ্দেশ্যে চলে গেছেন। আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছে বিষয়টি জানানো হলেও তারা তার স্ত্রীর অবস্থান সম্পর্কে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। ফলে শিশুটিকে লালন-পালন ও সেবা-যত্ন করা তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

এরপর চুক্তিপত্রে বলা হয়, এই পরিস্থিতিতে তিনি তার সন্তান জাহিদুল ইসলাম মুসাকে দ্বিতীয় পক্ষ মো. ইমরানের কাছে এক লাখ টাকার বিনিময়ে ‘দত্তক’ প্রদান করেছেন। একই সঙ্গে চুক্তিপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, প্রথম পক্ষ বা তার ভবিষ্যৎ ওয়ারিশরা কোনো অবস্থাতেই শিশুটির বিষয়ে দ্বিতীয় পক্ষের কাছে কোনো দাবি-দাওয়া করতে পারবেন না। এমনকি ভবিষ্যতে দাবি করা হলেও তা গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও চুক্তিপত্রে উল্লেখ রয়েছে।

চুক্তিপত্রের শেষাংশে মারুফ দাবি করেন, তিনি সুস্থ মস্তিষ্কে, স্বজ্ঞানে এবং কারও প্ররোচনা বা অনুরোধ ছাড়াই শিশুটিকে দ্বিতীয় পক্ষের কাছে দত্তক দিয়েছেন।

তবে সন্তান বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মারুফ মুন্সি। তিনি বলেন, ‘আমি আমার সন্তান বিক্রি করিনি। যাদের কাছে দেওয়া হয়েছে, তাদের সঙ্গে সন্তান বিক্রির কোনো চুক্তিও হয়নি। সন্তানটিকে শুধু লালন-পালনের জন্যই তাদের কাছে দিয়েছিলাম। তাদের সঙ্গে কথা ছিল, তারা যেন আমার সঙ্গে কোনো ধরনের প্রতারণা না করে। এ কারণেই মূলত কিছু টাকা নেওয়ার বিষয়টি এসেছিল।’

সন্তান দিয়ে টাকা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে মারুফ বলেন, ‘বিষয়টি আসলে সেভাবে ঘটেনি। আমি একটি কাগজে স্বাক্ষর করেছিলাম এবং সেখানে টাকার কথা উল্লেখ ছিল। তবে তা এক লাখ টাকা নয়, আমি মাত্র পাঁচ হাজার টাকা নিয়েছিলাম।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার কিছু দেনা ছিল, যা পরিশোধ করা খুব জরুরি হয়ে পড়েছিল। তাই ভেবেছিলাম কিছুদিন পর সন্তানকে আবার নিজের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে আসব। সন্তান বিক্রির কোনো উদ্দেশ্যে বা স্বার্থে আমি তাকে দিইনি। এখন বিষয়টি নিয়ে চারপাশে অনেক ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছে। আমি বুঝতে পারছি, কাজটি আমার ভুল হয়েছে। এই মুহূর্তে পরবর্তীতে কী করব, সেটাই বুঝে উঠতে পারছি না।’

স্থানীয় সূত্র ও পরিবারের সদস্যদের বরাতে জানা যায়, গত শনিবার (২৯ আগস্ট) সকালে মারুফ তার মা মাহফুজা বেগমের কাছ থেকে ছেলে মুসাকে ‘ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার’ কথা বলে বাড়ি থেকে বের হন। কিন্তু সন্ধ্যা পেরিয়ে গেলেও বাবা-ছেলে বাড়িতে না ফেরায় স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়। পরে পরিবারের সদস্যরা তাদের খোঁজ শুরু করেন।

একপর্যায়ে স্বজনরা জানতে পারেন, মারুফ তার ছেলে মুসাকে দশমিনা উপজেলার আলীপুর ইউনিয়নের রামনাথসেন গ্রামের ইমরান হোসেনের কাছে এক লাখ টাকার বিনিময়ে দিয়ে দিয়েছেন। অভিযোগ ওঠে, শিশুটিকে দেওয়ার পর পাওয়া টাকা দিয়ে মারুফ একটি আইফোন কিনেছেন। বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

ঘটনার খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার সৃষ্টি হয়। পরে খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে শিশুটিকে উদ্ধারের উদ্যোগ নেয়। অভিযানের একপর্যায়ে রোববার (৩০ আগস্ট) সন্ধ্যায় শিশুটির বাবা মারুফ মুন্সিকে আটক করা হয়।

পরে ওই দিন রাত ১০টার দিকে পুলিশ শিশুটিকে উদ্ধার করে। উদ্ধারের পর শিশু মুসাকে তার দাদা-দাদির জিম্মায় দেওয়া হয়। এ ঘটনায় শিশুটির নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনও উদ্যোগী হয়েছে।

দশমিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহমুদ হাসান শিশুটির ভবিষ্যৎ সুরক্ষা ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। এর অংশ হিসেবে শিশু মুসার নামে একটি ব্যাংক হিসাব খোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তার ভবিষ্যৎ প্রয়োজন মেটাতে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।

ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা চলছে। একদিকে তিন পাতার চুক্তিপত্রে এক লাখ টাকার বিনিময়ে শিশুটিকে ‘দত্তক’ দেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে, অন্যদিকে শিশুটির বাবা দাবি করছেন, তিনি সন্তান বিক্রি করেননি এবং মাত্র পাঁচ হাজার টাকা নিয়েছিলেন। ফলে প্রকৃতপক্ষে কীভাবে এবং কী শর্তে শিশুটিকে অন্যের কাছে দেওয়া হয়েছিল, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।