সারাদেশ

নাটোরের ২০০ বছরের ঐতিহ্য কাঁচাগোল্লায় ভেজালের থাবা, হারাচ্ছে সুনাম


সারাদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪১ পিএম

নাটোরের ২০০ বছরের ঐতিহ্য কাঁচাগোল্লায় ভেজালের থাবা, হারাচ্ছে সুনাম
ছবি: সংগৃহীত

নাটোরের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি কাঁচাগোল্লা। প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো এই মিষ্টির খ্যাতি একসময় ছড়িয়ে পড়েছিল দেশ-বিদেশে। রাজা-জমিদার থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের কাছে সমান জনপ্রিয় ছিল এর স্বতন্ত্র স্বাদ। তবে সময়ের সঙ্গে কাঁচাগোল্লার সেই ঐতিহ্য ও সুনাম এখন নানা কারণে হুমকির মুখে। নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার, ভেজাল এবং প্রকৃত কাঁচাগোল্লার আদলে অন্য মিষ্টি তৈরি করে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে কিছু ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে। ফলে প্রকৃত স্বাদের কাঁচাগোল্লা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ক্রেতারা।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অতিরিক্ত মুনাফার আশায় কিছু ব্যবসায়ী নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করে কাঁচাগোল্লা তৈরি করছেন। এমনকি নাটোরের বাসস্ট্যান্ড, ট্রেন ও বিভিন্ন পরিবহনেও ময়দা দিয়ে তৈরি লাড্ডু কাঁচাগোল্লা নামে বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব মিষ্টির সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী কাঁচাগোল্লার স্বাদ, গন্ধ ও গুণগত মানের কোনো মিল নেই। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কারণে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নাটোরের আসল কাঁচাগোল্লার সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টরা।

জনশ্রুতি অনুযায়ী, সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে নাটোর শহরের লালবাজার এলাকায় মধুসূদন পালের মিষ্টির দোকানে কাঁচাগোল্লার উৎপত্তি। পরবর্তী সময়ে ১৭৫৭ সালের দিকে মিষ্টিটি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। রাণী ভবানীর সময়ে নাটোরের কাঁচাগোল্লার সুখ্যাতি আরও ছড়িয়ে পড়ে। রাজা-জমিদারদের বিভিন্ন আয়োজন ও মিষ্টিমুখেও স্থান করে নেয় এই বিশেষ মিষ্টি। ধীরে ধীরে নাটোরের পরিচয়ের সঙ্গে কাঁচাগোল্লার নামও জড়িয়ে যায়।

ঐতিহ্য ও স্বাতন্ত্র্যের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৩ সালের ৮ আগস্ট কাঁচাগোল্লা ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্যের মর্যাদা লাভ করে। নাটোর জেলা প্রশাসনের আবেদনের পর শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর এটিকে দেশের ১৭তম জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। কাঁচাগোল্লা বর্তমানে নাটোর জেলার একমাত্র জিআই পণ্য।

স্থানীয়দের মতে, জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার পর কাঁচাগোল্লার পরিচিতি ও বাজার আরও বাড়ার কথা ছিল। কিন্তু মান নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগের অভাবে উল্টো এর ঐতিহ্য নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রকৃত কাঁচাগোল্লা তৈরিতে প্রয়োজন ভালো মানের দুধ থেকে তৈরি ছানা ও চিনি। নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় ছানা প্রস্তুত করে তা চিনি দিয়ে মিশিয়ে তৈরি করা হয় এই মিষ্টি। ঝরঝরে, নরম ও হালকা রসালো গঠন এবং স্বতন্ত্র স্বাদই আসল কাঁচাগোল্লার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

নাটোর জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে শতাধিক মিষ্টির দোকানে কাঁচাগোল্লা বিক্রি হয়। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ হাজার কেজি কাঁচাগোল্লা বিক্রি হয়। প্রতি কেজি কাঁচাগোল্লার দাম বর্তমানে প্রায় ৬০০ থেকে ৬৮০ টাকা। সে হিসাবে প্রতিদিন প্রায় ৬ লাখ টাকার কাঁচাগোল্লার বেচাকেনা হয়। এর উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছেন স্থানীয় শত শত মানুষ। বাড়ি বাড়ি থেকে গরুর দুধ সংগ্রহ, দুধ থেকে ছানা তৈরি, কাঁচাগোল্লা প্রস্তুত ও বাজারজাতকরণের বিভিন্ন ধাপে তৈরি হয়েছে কর্মসংস্থানের সুযোগ।

তবে ঐতিহ্যবাহী এই মিষ্টির বাণিজ্যিক সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। দেশের বাইরে এখনো কাঁচাগোল্লার নিয়মিত বাণিজ্যিক রপ্তানি শুরু হয়নি। ব্যবসায়ীদের দাবি, সরকারি প্রণোদনা, প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হলে কাঁচাগোল্লাকে রপ্তানিমুখী পণ্য হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। এতে একদিকে নাটোরের ঐতিহ্য আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি পাবে, অন্যদিকে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি ও কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে।

লালবাজারের জয়কালী বাড়ি মিষ্টির দোকানের স্বত্বাধিকারী রবীন্দ্রনাথ কুন্ড বলেন, ‘১৯৮০ সাল থেকে আমি এই দোকানে কাঁচাগোল্লা বিক্রি করে আসছি। এর আগে আমাদের বাপ-দাদারাও কাঁচাগোল্লা তৈরি করেছেন। একসময় প্রতিদিন কয়েক মণ কাঁচাগোল্লা বিক্রি হলেও এখন দিনে এক মণও বিক্রি হয় না। বর্তমানে মানসম্পন্ন কাঁচাগোল্লা তৈরির কারিগরও খুব কম।’

নাটোর চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মো. আব্দুল মান্নাফ বলেন, ‘কাঁচাগোল্লাকে রপ্তানিমুখী শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে হলে সরকারকে যথাযথ ভূমিকা রাখতে হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর উদ্যোগ প্রয়োজন।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কাঁচাগোল্লার ঐতিহ্য ও জিআই মর্যাদা ধরে রাখতে হলে প্রথমেই এর মান নিশ্চিত করা জরুরি। প্রকৃত কাঁচাগোল্লার নির্ধারিত উপকরণ, প্রস্তুতপ্রণালি ও গুণগত মান বজায় রাখার পাশাপাশি ভেজাল বা নিম্নমানের মিষ্টি কাঁচাগোল্লা নামে বিক্রি বন্ধে নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রকৃত উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করে তাদের সহায়তা এবং দক্ষ কারিগর তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলছেন তারা।

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের নিয়ে বছরে একবার উদ্বুদ্ধকরণ সভার আয়োজন করা হয়। তবে শুধু সভা বা সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে নিয়মিত বাজার তদারকি, মান নিয়ন্ত্রণ এবং জিআই পণ্যের সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এখনই যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া না হলে দীর্ঘদিনের এই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির স্বাতন্ত্র্য ও সুনাম আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এ বিষয়ে নাটোরের জেলা প্রশাসক মোছা. সুমনী আক্তারের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।