সারাদেশ

মা গৃহপরিচারিকা, থাকেন ভাড়া বাসায়, স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় আটকে গেল শিক্ষক পদে নিয়োগ


সারাদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৩ পিএম

মা গৃহপরিচারিকা, থাকেন ভাড়া বাসায়, স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় আটকে গেল শিক্ষক পদে নিয়োগ
ছবি: সংগৃহীত

মা গৃহপরিচারিকার কাজ করে কষ্টে সংসার চালিয়েছেন। সেই কষ্টের মধ্যেই ছেলেকে পড়ালেখা করিয়েছেন। মিশন আচার্যও মায়ের সেই ত্যাগের মর্যাদা রাখতে মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করেছেন। এসএসসিতে জিপিএ-৫, এইচএসসিতে জিপিএ-৪ দশমিক ৮৩ পেয়ে ভর্তি হন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। এরপর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সুপারিশপ্রাপ্তও হন। তবে চাকরি পাওয়ার শেষ ধাপে এসে তাঁর স্বপ্ন আটকে গেছে ‘স্থায়ী ঠিকানা’র জটিলতায়।

৩০ বছর বয়সী মিশন আচার্য ঝিনাইদহ শহরের কলাবাগান এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় পরিবারের সঙ্গে বসবাস করেন। নিজেদের কোনো ভিটেবাড়ি না থাকায় চাকরির আবেদনে তিনি ভাড়া বাসার ঠিকানাই স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। নিয়োগ পরীক্ষায় সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর পুলিশি যাচাইও সম্পন্ন হয়েছে। তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্র ও শিক্ষাসনদেও কলাবাগানের ঠিকানা রয়েছে। এরপরও স্থায়ী ঠিকানা না পাওয়ার কারণ দেখিয়ে তাঁকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়নি।

মিশন আচার্য জানান, তাঁর সঙ্গে একই নিয়োগে মোট ১৮২ জন সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ১৮০ জন নিয়োগপত্র পেয়েছেন। বাকি দুজনের একজনের বিরুদ্ধে মামলা থাকায় নিয়োগপত্র পাননি। আর তিনি স্থায়ী ঠিকানা সংক্রান্ত জটিলতার কারণে নিয়োগপত্র থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

গতকাল বুধবার সকালে ঝিনাইদহ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের সামনে কথা হয় মিশন আচার্যের সঙ্গে। নিজের জীবনের গল্প বলতে গিয়ে তিনি জানান, তাঁরা দুই ভাই। বড় ভাই শৈলেন আচার্য অন্য একজনের সঙ্গে অংশীদারত্বে কাপড়ের ব্যবসা করেন। তাঁদের বাবা নন্দ আচার্যের বাড়ি যশোরে। মা ময়না আচার্যের সঙ্গে বিয়ের পর তিনি ঝিনাইদহে এসে বসবাস করতেন। তবে স্ত্রীকে কখনো যশোরের বাড়িতে নিয়ে যাননি।

ঝিনাইদহ শহরের কলাবাগান এলাকায় ভাড়া বাসাতেই তাঁদের সংসার চলত। মিশন আচার্যের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর বড় ভাইয়ের জন্মও ঝিনাইদহে। তিনি মায়ের গর্ভে আসার পর তাঁর বাবা বাড়ি ছেড়ে চলে যান। এরপর আর কখনো ফিরে আসেননি।

বাবা চলে যাওয়ার পর দুই সন্তানকে নিয়ে চরম অসহায় অবস্থায় পড়েন ময়না আচার্য। সংসার চালানো এবং সন্তানদের পড়ালেখার খরচ জোগাতে তিনি অন্যের বাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ শুরু করেন। দীর্ঘদিন এ কাজ করেই দুই ছেলেকে বড় করেছেন তিনি। সংসারের আর্থিক সংকটের কারণে বড় ভাই শৈলেন আচার্যও বেশি দূর পড়াশোনা করতে পারেননি।

তবে ছোট ছেলে মিশনের পড়ালেখা থামতে দেননি মা। মিশন এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়ার পর তাঁর পড়ালেখার প্রতি মায়ের আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। নানা কষ্টের মধ্যেও ছেলেকে উচ্চশিক্ষিত করার চেষ্টা চালিয়ে যান তিনি। মিশন এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৪ দশমিক ৮৩ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। পরে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

মিশন আচার্য বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর তিনি নিয়োগপত্র পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু নিয়োগসংক্রান্ত বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে খোঁজ নিতে গেলে তাঁকে জানানো হয়, তাঁর কোনো স্থায়ী ঠিকানা পাওয়া যায়নি। এ কারণে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়নি।

মিশনের ভাষ্য, ছোটবেলা থেকেই ঝিনাইদহ শহরের কলাবাগান এলাকায় তিনি বড় হয়েছেন। বর্তমানে শহিদুল ইসলামের বাড়িতে ভাড়া থাকেন। তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্র এবং শিক্ষাসনদগুলোতেও কলাবাগানের ঠিকানা রয়েছে। নিয়োগের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর তাঁর বর্তমান ঠিকানায় পুলিশি যাচাইও করা হয়েছে। এরপরও কেন তাঁকে স্থায়ী ঠিকানা না থাকার কারণে নিয়োগপত্র দেওয়া হচ্ছে না, তা নিয়ে তিনি অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।

মিশন জানান, তাঁর নানাবাড়ি ঝিনাইদহ সদর উপজেলার পণ্ডিতপুর গ্রামে। তাঁর বাবা জীবনের একটা সময় সেখানে ছিলেন। নিজেদের কোনো ভিটেবাড়ি না থাকায় তাঁর মামা বিষ্ণুপদ বিশ্বাস ২০২২ সালে পণ্ডিতপুরে বাড়ি করার জন্য তাঁকে দুই শতক জমি দেন। কিন্তু অর্থের অভাবে সেখানে এখনো বাড়ি করা সম্ভব হয়নি। চাকরি পাওয়ার পর ওই জমিতে বাড়ি করে পরিবার নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করার পরিকল্পনা ছিল তাঁর।

মিশনের সঙ্গে একই নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া মহেশপুর উপজেলার ন্যাপা এলাকার বাসিন্দা জিহাদ হোসেন নিয়োগপত্র পেয়েছেন। তিনি বলেন, মিশন আচার্যের মতো একজন সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থী স্থায়ী ঠিকানার কারণে নিয়োগপত্র না পাওয়ার বিষয়টি শুনে তাঁদের খারাপ লেগেছে। কয়েকজন বন্ধু মিলে তাঁরা বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তাঁদের জানানো হয়েছে, বিষয়টি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে সমাধান করতে হবে।

এ বিষয়ে ঝিনাইদহ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আমজাদ হোসেন বলেন, মিশন আচার্য ও তাঁর বন্ধুরা এসে বিষয়টি জানানোর পর তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছেন। বিষয়টি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। দ্রুত এর একটি সমাধান হবে বলে তিনি আশা করছেন।

মিশন আচার্যের বড় ভাই শৈলেন আচার্য বলেন, তাঁদের জীবন অত্যন্ত কষ্টের মধ্য দিয়ে কেটেছে। তাঁদের মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে দুই ভাইকে বড় করেছেন। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও মিশন পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন এবং শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। এখন শুধু বাড়িঘর না থাকার কারণে চাকরিতে যোগ দিতে না পারায় পরিবারটি হতাশ।

বিষয়টি নিয়ে ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন বলেন, মিশন আচার্যের নিয়োগের ক্ষেত্রে স্থায়ী ঠিকানা নিয়ে একটি জটিলতা তৈরি হয়েছে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে বিষয়টি লিখিতভাবে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরকে জানানো হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, বিষয়টির একটি সমাধান হবে।

এর আগে ২০২২ সালে বরিশালের কলেজছাত্রী আসপিয়া ইসলামের পুলিশে চাকরির ক্ষেত্রেও ‘ভূমিহীন’ থাকার বিষয়টি জটিলতা তৈরি করেছিল। বিষয়টি নিয়ে তখন ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়। পরে তাঁকে পুলিশের ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবল (টিআরসি) পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। মিশন আচার্যের ক্ষেত্রেও এখন স্থায়ী ঠিকানা নিয়ে তৈরি হওয়া জটিলতার সমাধানের অপেক্ষায় তাঁর পরিবার।