সারাদেশ

ইয়াবার নামে বিক্রি হচ্ছে জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি, খেলে শরীরে কী ঘটে?


সারাদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৪২ পিএম

ইয়াবার নামে বিক্রি হচ্ছে জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি, খেলে শরীরে কী ঘটে?
ছবি: সংগৃহীত

মাত্র এক টাকার একটি ছোট ওষুধের বড়ি। বাজার থেকে কিনে তাতে লাল বা গোলাপি রঙের প্রলেপ দেওয়া হচ্ছে। এরপর সেই বড়িই মাদকসেবীদের কাছে ‘ইয়াবা’ নামে বিক্রি করা হচ্ছে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত দামে। তবে এটি প্রকৃত ইয়াবা নয়-জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি ও কোষ্ঠকাঠিন্যের ওষুধ রং করে ইয়াবার আদলে তৈরি করে বিক্রি করছে একটি চক্র। অজানা ওষুধকে মাদক হিসেবে সেবনের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন মাদকসেবীরা।

রাজশাহী মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় এমন অভিনব প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, নগরীর আইডি বাগানপাড়া রেললাইন এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই মাদক কেনাবেচার জন্য পরিচিত। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সেখানে বিভিন্ন ধরনের মাদক কেনাবেচা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। মাদকসেবীদের আনাগোনাও দেখা যায় নিয়মিত।

স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু আইডি বাগানপাড়া নয়, নগরীর চন্দ্রিমা থানার বারো রাস্তা, বুধপাড়া, কোট ঢালান, গুড়িপাড়া, রাজশাহী নিউমার্কেট এলাকা ও হরিপুরসহ বিভিন্ন স্থানেও কৌশলে ইয়াবা এবং ইয়াবার আদলে তৈরি ট্যাবলেট বিক্রির চক্র সক্রিয় রয়েছে। কম দামে মাদক পাওয়ার আশায় এসব স্থানে তরুণসহ বিভিন্ন বয়সী মাদকসেবীরা ভিড় করছেন বলে দাবি স্থানীয়দের।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রকৃত ইয়াবার পাশাপাশি জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি ‘মায়াপিল’ এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের ওষুধ ‘ডুরালাক্স’ ট্যাবলেটও রং করে ইয়াবার আদলে বিক্রি করা হচ্ছে। এসব ট্যাবলেটের গায়ে লাল বা গোলাপি রঙের মার্কার কিংবা সাইনপেনের কালি লাগিয়ে ইয়াবার মতো চেহারা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এরপর সেগুলোকে প্রকৃত ইয়াবা বলে মাদকসেবীদের কাছে বিক্রি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

নগরীর আইডি বাগানপাড়ায় রাফিউল ইসলাম নামে এক মাদকসেবীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঘন ঘন অভিযানের কারণে অনেক বিক্রেতা বর্তমানে প্রকৃত ইয়াবা বিক্রি করছে না। তিনি জানান, এক ব্যক্তির কাছ থেকে ২৮০ টাকা করে দুই পিস ‘মাল’ কিনেছিলেন। পরে সেবনের পর বুঝতে পারেন, সেগুলো ইয়াবা নয়, অন্য কোনো ওষুধ। কারণ, বড়ি খাওয়ার পর তার পায়খানার বেগ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।

সামসুল ইসলাম নামে আরেক মাদকসেবী জানান, ইয়াবার মতো দেখতে করে এসব বড়ি বিক্রি করা হয়। তার ভাষ্য, ‘মায়া বড়ি’ রং করে অনেক সময় ইয়াবা হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে।

চিকিৎসকদের মতে, মায়াপিল কোনো মাদক নয়। এটি একটি যৌগিক মুখে খাওয়ার জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি। মায়াপিলের ২৮টি ট্যাবলেটের প্যাকেটে সাধারণত ২১টি হরমোনযুক্ত ট্যাবলেট ও ৭টি আয়রন ট্যাবলেট থাকে। হরমোনযুক্ত প্রতিটি সাদা ট্যাবলেটে রয়েছে ইথিনাইল এস্ট্রাডিওল ০.০৩ মিলিগ্রাম এবং লেভোনরজেস্ট্রেল ০.১৫ মিলিগ্রাম। আর বাদামি ট্যাবলেটে রয়েছে ফেরাস ফিউমারেট ৭৫ মিলিগ্রাম।

মায়াপিলের মূল উদ্দেশ্য হলো গর্ভধারণ প্রতিরোধ করা। এর হরমোন ডিম্বস্ফোটন বন্ধ বা দমন করতে সাহায্য করে। পাশাপাশি জরায়ুমুখের শ্লেষ্মায় পরিবর্তন ঘটিয়ে শুক্রাণুর প্রবেশ কঠিন করে তোলে। অর্থাৎ এটি নির্দিষ্ট চিকিৎসাগত উদ্দেশ্যে ব্যবহারের জন্য তৈরি একটি গর্ভনিরোধক ওষুধ, কোনোভাবেই মাদক নয়।

অন্যদিকে, ডুরালাক্স ৫ মিলিগ্রামও সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের ওষুধ। এর কার্যকর উপাদান বিসাকোডিল। এটি একটি স্টিমুল্যান্ট ল্যাক্সেটিভ বা রেচক, যা মূলত কোষ্ঠকাঠিন্যের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসা পরীক্ষা বা কোলন পরীক্ষার আগে অন্ত্র পরিষ্কার করতেও বিসাকোডিল ব্যবহার করা হয়।

চিকিৎসকদের মতে, ডুরালাক্স প্রয়োজন ছাড়া কিংবা অতিরিক্ত মাত্রায় সেবন করলে শরীরে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। অতিরিক্ত ব্যবহারে ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা এবং শরীরের তরল ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে। দীর্ঘদিন বা অতিরিক্ত ব্যবহারের ক্ষেত্রে রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা কমে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। ফলে কোনো চিকিৎসাগত প্রয়োজন ছাড়া এটিকে ইয়াবা ভেবে সেবন করা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ শংকর কে বিশ্বাস বলেন, ইয়াবা একটি মাদকদ্রব্য হলেও ডুরালাক্স ও মায়াপিল মাদক নয়। কিন্তু এসব ওষুধে রং মিশিয়ে কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া রোগের প্রয়োজন না থাকা অবস্থায় সেবন করলে শরীরে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে।

অপরাধ বিশ্লেষক সুব্রত কুমার পাল বলেন, সস্তা ওষুধে রং করে ইয়াবার আদলে বাজারজাত করার ঘটনা মাদক ব্যবসার একটি নতুন ও উদ্বেগজনক কৌশল হতে পারে। প্রকৃত মাদকের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান জোরদার হলে অসাধু চক্রগুলো মাদকসেবীদের চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে বিকল্প পদ্ধতিতে প্রতারণার চেষ্টা করতে পারে।

এ বিষয়ে রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও উপ-পুলিশ কমিশনার গাজিউর রহমান বলেন, শুধু ইয়াবা নয়, সব ধরনের মাদকদ্রব্যের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে মহানগর পুলিশ বিভিন্ন মাদক বিক্রির আস্তানা উচ্ছেদ করেছে এবং সেসব স্থান থেকে অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে মায়াপিল ও ডুরালাক্স রং করে ইয়াবার আদলে বিক্রি করার বিষয়টি তার জানা নেই বলে জানান তিনি।

জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান চলমান রয়েছে। ওষুধে রং করে মাদক হিসেবে বিক্রি করা নতুন কোনো কৌশল হয়ে থাকতে পারে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কারও বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকৃত মাদক ও নকল মাদকের পার্থক্য না বুঝে অজানা ট্যাবলেট সেবন করা মাদকসেবীদের জন্য নতুন ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি বা কোষ্ঠকাঠিন্যের ওষুধকে ইয়াবা হিসেবে সেবন করলে প্রত্যাশিত মাদকীয় প্রভাবের পরিবর্তে ওষুধের কার্যকর উপাদান অনুযায়ী শরীরে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। তাই অজানা কোনো ট্যাবলেটকে মাদক ভেবে সেবন না করার পাশাপাশি এ ধরনের প্রতারণার বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি ও অভিযান আরও জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।