পর্যটন
সেন্টমার্টিন রক্ষায় মাত্র ৪ কিলোমিটারে সীমাবদ্ধ হচ্ছে পর্যটন এলাকা
দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনের বিপন্ন জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। দ্বীপের বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারে পর্যটন এলাকাকে মাত্র ৪ কিলোমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ করাসহ আরও বেশ কিছু বৈপ্লবিক পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
সম্প্রতি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রণীত এক খসড়া মহাপরিকল্পনায় দ্বীপটিকে ৪টি জোনে ভাগ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, পর্যটক সংখ্যা নির্ধারণের আগ পর্যন্ত দ্বীপটিতে একসঙ্গে রাত যাপন করতেন ৭ হাজার ১৯৩ জন পর্যটক, যা দ্বীপটির ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ। এর ফলে প্রবাল সংগ্রহ, নৌযানের দূষণ ও সমুদ্রসৈকতে আবর্জনার চাপ বেড়ে গিয়ে প্রবালপ্রাচীর অস্তিত্ব সংকটে পড়ে।
দশকের পর দশক ধরে অনিয়ন্ত্রিত উন্নয়ন, লাগামহীন পর্যটন এবং রাষ্ট্রীয় অবহেলার কারণে সেন্টমার্টিনের সূক্ষ্ম বাস্তুতন্ত্র আজ ভেঙে পড়ছে। প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উপেক্ষা করে গড়ে ওঠা বাণিজ্যিক হোটেল-রিসোর্ট ও অবকাঠামোর চাপে বিপন্ন হচ্ছে দ্বীপের পরিবেশ ও স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা।
এই বাস্তবতায় সেন্টমার্টিন সংরক্ষণের লক্ষ্যে দ্বীপটিকে চারটি পৃথক জোনে ভাগ করার প্রস্তাব এসেছে খসড়া মহাপরিকল্পনায়। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) প্রণীত এ পরিকল্পনা গত ৬ জানুয়ারি রাজধানীর একটি কর্মশালায় উপস্থাপন করা হয়।
খসড়া মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, আট বর্গকিলোমিটারের দ্বীপটিকে চারটি জোনে ভাগ করা হবে।
এর মধ্যে ‘সাধারণ ব্যবহার এলাকা’ বা জোন–১–এ সীমিত পর্যটন ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম চালানো যাবে। দ্বীপের সব হোটেল ও রিসোর্ট এই জোনে স্থানান্তরের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে এবং এখানেই পর্যটকদের রাতযাপনের অনুমতি থাকবে। পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৯০০ জন পর্যটক প্রবেশের সীমা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
জোন–২ বা নিয়ন্ত্রিত সম্পদ এলাকায় দিনে পর্যটক প্রবেশ করতে পারলেও রাতযাপন নিষিদ্ধ থাকবে। এটি কচ্ছপের প্রজনন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত এবং এখানে পর্যটন অবকাঠামো ও ক্ষতিকর কৃষি রাসায়নিক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা থাকবে।
জোন–৩ বা টেকসই ব্যবস্থাপনা অঞ্চলে বসতি স্থাপন ও অবকাঠামো নির্মাণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। ম্যানগ্রোভ বন, ল্যাগুন ও কচ্ছপের প্রজনন ক্ষেত্র এই জোনে বিশেষ সুরক্ষার আওতায় থাকবে।
ছেঁড়াদিয়া দ্বীপ নিয়ে গঠিত জোন–৪ বা সংরক্ষিত এলাকায় সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত থাকবে। এই জোনের এক কিলোমিটারের মধ্যে মাছ ধরা, দূষণ সৃষ্টি ও বন্য প্রাণী বিরক্ত করার ওপর কড়াকড়ি আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, ‘সেন্টমার্টিন ও পর্যটন কখনোই সমার্থক হতে পারে না। এই দ্বীপের প্রথম অগ্রাধিকার হতে হবে সংরক্ষণ।’ তিনি জানান, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত পর্যটক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার ফলে দ্বীপের বাস্তুতন্ত্র ইতোমধ্যে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, সেন্টমার্টিনের প্রায় ৭০ শতাংশ প্রবাল ইতোমধ্যে ধ্বংস হয়ে গেছে। অতিরিক্ত লবস্টার আহরণ ও জাহাজের নোঙরের আঘাতে প্রবালপ্রাচীর প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
খসড়া মহাপরিকল্পনায় বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার, পর্যটন নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা সুরক্ষা এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলাকে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের সুপারিশও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পনা শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না—বাস্তবায়নে কঠোরতা না আনলে দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন ভবিষ্যতে কেবল স্মৃতিতেই টিকে থাকবে।