ক্যাম্পাস

রাঙামাটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাহাড় কেটে ভবন নির্মাণ


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ নভেম্বর ২০২৫, ০২:০৪ পিএম

রাঙামাটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাহাড় কেটে  ভবন নির্মাণ
ছবি: সংগৃহীত

২০০১ সালে রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আইন পাস হয়। শিক্ষাকার্যক্রম শুরু হয় ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে। ক্লাস শুরু হয় ২০১৫ সালের নভেম্বরে। এরপর ২০২০ সালে বর্তমান ক্যাম্পাসে কার্যক্রম শুরু হয়।

বর্তমানে, রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবিপ্রবি) ভবন নির্মাণের জন্য চলছে পাহাড় কাটা। একাডেমিক, প্রশাসনিক ও শিক্ষার্থীদের আবাসিক হল করার জন্য পাহাড় কাটছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) প্রতিবেদন অনুমোদনের আগেই পাহাড় কাটা শুরু করেছে বিশ্ববিদ্যালয়। আবার সম্ভাব্য যে পরিমাণ পাহাড় কাটার কথা বলা হয়েছিল, তার চেয়ে বেশি কাটা হয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের নথি অনুযায়ী, এসব ভবন নির্মাণ করতেও ২০১৮ সালে পাহাড় কেটেছিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ওই সময় ৬০ হাজার ঘনফুট পাহাড় কাটা হয়। কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়াই তখন পাহাড় কাটা হয়। ওই সময় পরিবেশ অধিদপ্তরের রাঙামাটিতে কোনো কার্যালয় বা কার্যক্রম ছিল না। ফলে তখন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

পরিবেশ অধিদপ্তরের এক নথিতে দেখা গেছে, ইআইএ প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটি ভবন নির্মাণের জন্য ১৪ হাজার ৪২৯ ঘনমিটার বা ৫ লাখ ৯ হাজার ঘনফুট পাহাড় কাটার কথা বলা হয়েছে। আর পাহাড়গুলো কাটতে হবে ৪৫ ডিগ্রি স্লোপ রেখে। পাহাড় কাটার কথা ধাপে ধাপে। কিন্তু এসবের কিছুই করেনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। পাহাড়ের ঢাল কেটে সম্পূর্ণ বিলীন করে পাইলিং করা হয়েছে। আর পাহাড় কাটা হয়েছে ৭ লাখ ১৯ হাজার ঘনফুট। অর্থাৎ সম্ভাব্য পরিমাণের চেয়ে ২ লাখ ১০ হাজার ঘনফুট বেশি, যা আড়াইটি ফুটবল মাঠের সমান। 

দেখা যায়,যে পরিমাণ পাহাড় কাটার কথা ধরা হয়েছিল তার চেয়ে বেশি পাহাড় কেটেছে কর্তৃপক্ষ। অনুমোদনের আগে এবং অতিরিক্ত পাহাড় কাটার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা পরিবেশ অধিদপ্তরকে জবাব দেবে। এভাবে পাহাড় কাটার কারণে পাহাড়ধসসহ নানা ধরনের বিপদ তৈরি হওয়ার শঙ্কার কথা জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

‘রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন (দ্বিতীয় সংশোধিত)’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একটি একাডেমিক ভবন, একটি প্রশাসনিক ভবন, ছাত্রদের জন্য একটি হল এবং ছাত্রীদের জন্য একটি হল নির্মাণ করা হচ্ছে। সব কটি ভবন তিনতলাবিশিষ্ট। রাঙামাটির আসামবস্তি সংযোগ সড়কের ঝগড়া বিল এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস। এখানেই চলছে পাহাড় কেটে চারটি ভবনের নির্মাণকাজ। গত ফেব্রুয়ারিতে ভবনগুলোর নির্মাণকাজ শুরু হয়। এসব ভবনের আয়তন ৮১ হাজার বর্গফুট। ১৬ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবনের নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন উপাচার্য মো. আতিয়ার রহমান।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, বর্তমান প্রশাসনিক ভবনের পাশেই চলছে একাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবনের নির্মাণকাজ। আরেক পাশে নির্মাণ করা হচ্ছে শিক্ষার্থীদের জন্য ভবন। এসব ভবন নির্মাণের জন্য খননযন্ত্র দিয়ে পাহাড় কাটা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ছাত্র হল ছাড়া অন্য তিনটি ভবনের বেজমেন্টের কাজ শেষ হয়েছে। ছাত্র হলের বেজমেন্টের কাজও প্রায় শেষের পথে।

২০১৭ সালে পাহাড় ধসে রাঙামাটিতে ১২০ জনের মৃত্যু হয়। জেলার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রধান সড়ক রাঙামাটি-চট্টগ্রাম, রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি-কাপ্তাই ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

নির্বিচার পাহাড় কাটার কারণে ওই সময় পাহাড়ি ঢাল ভেঙে পড়েছিল বলে রাঙামাটি পৌরসভার জন্য প্রণয়ন করা মহাপরিকল্পনায় বলা হয়। এতে বলা হয়, আসামবস্তি থেকে বিলাইছড়ি, রাজবাড়ি ও কাটাছড়ি এলাকায় ঐতিহ্য ও স্থানীয় সংস্কৃতি বজায় রেখে অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। কিন্তু ভবন নির্মাণের জন্য লোকজন পাহাড়ের ঢাল কেটে সমতল বানায়। এটি পাহাড়ের গঠনকে ভারসাম্যহীন করে তোলে। ভারী বৃষ্টির সময় পাহাড়ের মাটি আলগা হয়ে ঢালে নির্মিত ভবনগুলোসহ ভেঙে পড়ে। এর ফলে জীবন ও সম্পত্তি নষ্ট হয়। নতুন এলাকার উন্নয়নে সব ফাঁকা কৃষিজমি অধিগ্রহণ করা, পাহাড় কাটা এবং জলাধার ভরাট করা অপ্রয়োজনীয়।

এসব ভবন নির্মাণের জন্য গত ২০ মে অবস্থানগত ছাড়পত্র দেয় পরিবেশ অধিদপ্তর। এরপর গত ২১ আগস্ট ‘রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন (দ্বিতীয় সংশোধিত)’ শীর্ষক প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) প্রতিবেদন অনুমোদনের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরে আবেদন করা হয়। এখনো এর অনুমোদন দেওয়া হয়নি। এর আগেই পাহাড় কেটে অবকাঠামোগত উন্নয়নকাজ শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্পের পরিচালক আবদুল গফুর বলেন, পাহাড় কাটা বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরকে জবাব দেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান। এ বিষয়ে উপাচার্য বিস্তারিত জানাতে পারবেন।

রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আতিয়ার রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান পাহাড়ের ওপর। পাহাড়ের মাটি না কেটে কিংবা গর্ত না করে ভবন করা সম্ভব নয়। ভবনের নকশা অনুযায়ী যেটুকু মাটি কাটার কথা, হয়তো তার চেয়ে বেশি মাটি কাটা হয়েছে। কেন বেশি কাটা হলো, সে বিষয়ে ভালো জানবেন প্রকল্প পরিচালক, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। যেভাবে দেখভাল করার কথা ছিল, সেখানে নিশ্চয় কোনো ঘাটতি ছিল। সামনের দিকে এ বিষয়ে আরও অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

রাঙামাটিতে যে ধরনের স্থাপনাই হোক, অবশ্যই পাহাড়কে বিবেচনা নিয়ে করতে হবে। এখন পাঁচ লাখ ঘনফুটের কথা বলে সাত লাখ ঘনফুট পাহাড় কাটা হয়েছে। কিন্তু এর প্রভাব আরও বেশি হবে। কেননা রাঙামাটির পাহাড়গুলো বালুর পাহাড়। একবার পাহাড় কাটা হলে পরবর্তী বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির সময় আরও বেশি মাটি ধসে পড়বে। তাই পাহাড় যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেভাবে ভবনগুলো করা দরকার।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ আল-আমীন বলেন, রাঙামাটিতে যে ধরনের স্থাপনাই হোক, অবশ্যই পাহাড়কে বিবেচনা নিয়ে করতে হবে। এখন পাঁচ লাখ ঘনফুটের কথা বলে সাত লাখ ঘনফুট পাহাড় কাটা হয়েছে। কিন্তু এর প্রভাব আরও বেশি হবে। কেননা রাঙামাটির পাহাড়গুলো বালুর পাহাড়। একবার পাহাড় কাটা হলে পরবর্তী বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির সময় আরও বেশি মাটি ধসে পড়বে। তাই পাহাড় যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেভাবে ভবনগুলো করা দরকার।