রাজধানী
ওয়াসার লাইন কবে পৌঁছাবে বস্তির দরজায়?
ঢাকার বিভিন্ন বস্তিতে প্রতিদিনই বিশুদ্ধ পানির জন্য হাহাকার চলছে। ওয়াসার লাইনে সংযোগ না থাকায় হাজারো মানুষকে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে বা টাকায় পানি কিনে ব্যবহার করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় পানি একটি পণ্যে পরিণত হয়েছে, যার দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
মিরপুরের রূপনগর (শিয়ালবাড়ি বস্তি) বস্তির বাসিন্দা শিরিন আক্তার বলেন, “ওয়াসার লাইন আমাদের বস্তিতে আসে না। একটা পানির ট্যাংক থেকে প্রতিদিন ২০ টাকায় দুই গ্যালন পানি কিনতে হয়। এভাবে টাকা দিয়ে আর কত দিন চলবো?”
রূপনগর বস্তিতে অনেকেই বোতলজাত পানি বা বিক্রি করা ট্যাংকির পানি ব্যবহার করে, কারণ সরাসরি ট্যাপের পানি নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত। স্থানীয়রা জানিয়েছে, পানিতে কালচে রঙ ও দুর্গন্ধ থাকে; রান্নার কাজে ব্যবহার করলে খাবারের স্বাদও নষ্ট হয়ে যায়।
রাজধানীতে বর্তমানে প্রায় ৩,৩৯৪টি বস্তি রয়েছে (BBS Slum Census 2014 অনুযায়ী)। সেখানে বসবাস করছে আনুমানিক ৩০ লাখ মানুষ।যদিও বর্তমানে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০ লক্ষের কাছাকাছি। কিন্তু ওয়াসার হিসাব অনুযায়ী এসব বস্তির মাত্র ১৫ শতাংশ এলাকায় বৈধ পানি সংযোগ আছে। বাকিদের নির্ভর করতে হয় স্থানীয় পানি বিক্রেতা বা “মিনি ওয়াসা”র ওপর, যারা পাইপ বা ট্যাংকের মাধ্যমে প্রতি লিটার পানির দাম ১০–১৫ গুণ বাড়িয়ে বিক্রি করে।
ওয়াসার একজন কর্মকর্তা জানান, “অবৈধ সংযোগ বন্ধ করতে গিয়ে অনেক জায়গায় সমস্যা তৈরি হয়। তবে আমরা ধীরে ধীরে বস্তিগুলোতে বৈধ সংযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা নিচ্ছি।”
তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। পানির এই বাণিজ্যে স্থানীয় দালালচক্র সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। অনেকেই বলেন, তারা মাসে একবার টাকা না দিলে পানি বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো বাধ্য হয়ে ন্যায্য মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি টাকা গুনছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শহুরে দারিদ্র্যের অন্যতম বড় কারণ এই পানি বঞ্চনা। BRAC Urban Development Programme-এর এক গবেষণায় দেখা যায়, একেকটি পরিবারের মাসিক আয়ের প্রায় ১২ শতাংশ শুধু পানি কেনার পেছনে খরচ হয়। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও আর্থিক চাপ দুই-ই বাড়ছে। অপরিকল্পিত পানি ব্যবস্থাপনার কারণে অনেক সময় দূষিত পানি ব্যবহার করায় ডায়রিয়া ও ত্বকের রোগও ছড়িয়ে পড়ছে।
পরিবেশবিদরা বলছেন, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা না দিলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (SDG 6) অর্জন সম্ভব হবে না। সরকারি উদ্যোগে স্থায়ী পানি সরবরাহ ব্যবস্থা না গড়ে তুললে, ঢাকার বস্তিগুলোর “পানি সংকট” শিগগিরই “জীবন সংকটে” রূপ নিতে পারে।