অপরাধ
জুলাই হত্যা মামলার আসামি ও কিশোর গ্যাং লিডার আর এস ফাহিম দেশে ফিরেছে
রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার কথিত কিশোর গ্যাং লিডার ও ফেসবুক ব্লগার আর এস ফাহিম চৌধুরী দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর দেশে ফিরেছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে তার দেশে ফেরার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য নিশ্চিত করা হয়নি।
শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) রাতে তিনি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে দেশে ফিরেছেন। আর এস ফাহিম নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একাধিক স্টোরিতে এ দাবি করেন। এরপর থেকেই বিষয়টি নিয়ে নেটিজেনদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
তার বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় মোহাম্মদপুর-আদাবর এলাকায় সাধারণ ছাত্র-জনতার ওপর হামলা ও হত্যার অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, রাজধানীর বাড্ডা থানাসহ একাধিক থানায় তার বিরুদ্ধে হত্যা ও হত্যাচেষ্টা মামলা রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে বাড্ডা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী নাসিরুল আমিন বলেন, তার থানায় আর এস ফাহিমের বিরুদ্ধে মামলা আছে কিনা তা তার জানা নেই। এছাড়া তিনি দেশে ফিরেছেন কিনা, সেটিও নিশ্চিত করতে পারেননি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন—মামলার আসামি হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে তিনি নির্বিঘ্নে দেশে ফিরলেন। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, তাকে বিমানবন্দরে ফুল দিয়ে সংবর্ধনা জানানো হয়েছে এবং গাড়িবহর নিয়ে এলাকায় শোডাউন করেছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ফেসবুকে রেজওয়ান মাসুদ নামে এক ব্যবহারকারী দাবি করেন, ‘আর এস ফাহিম চৌধুরী কার সিগন্যাল পেয়ে দেশে আসছে? সে এবং তার স্ত্রী কী করেছে, তা দেশের জনগণ ভালোভাবেই জানে। সুতরাং সাধু সাবধান।’
এমডি আসরাফুল ইসলাম নামে আরেক ব্যবহারকারী লেখেন, ‘জুলাইয়ে যখন গুলি করে আমার ভাইদের শহীদ করা হচ্ছিল, তখন তা দেখে এক জানোয়ার উল্লাস করছিল। হ্যাঁ, সেই জানোয়ারটি হলো আর এস ফাহিম চৌধুরী। মোহাম্মদপুরের ত্রাস রাজীবের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত এই ফাহিম রাজীব ও আওয়ামী লীগের কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে যুক্ত ছিল। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে মাদক ও নারী কারবারের অভিযোগ রয়েছে। জুলাইয়ে নিজেকে শিক্ষার্থীদের পক্ষে দাবি করলেও বাস্তবে আওয়ামী লীগের পিআর পরিচালনায় সক্রিয় ছিল এই ব্যক্তি। আজ তার শোডাউন দেখে হৃদয়ে যেন রক্তক্ষরণ শুরু হয়। যখন আমার ভাইদের রক্ত রাজপথে ভেসে যাচ্ছিল, তখন এই জানোয়ার হাসতে হাসতে উল্লাস করছিল। ৫ আগস্টের পর তাকে কে আশ্রয় দিয়ে দেশ থেকে নিরাপদে বের করে দিয়েছে, সেটাও আমরা জানি। যাই হোক, এখন তাকে কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া যাবে না। অতিদ্রুত তাকে আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি।’
এর আগে প্রবাসী সাংবাদিক জাওয়াদ নির্ঝর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে দাবি করেছিলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় বাড্ডা থানার একটি হত্যা মামলার আসামি হিসেবে আর এস ফাহিম বিদেশে পালিয়ে যান। সেখানে মোহাম্মদপুরের সাবেক কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীবের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় অংশ নেওয়ার অভিযোগও তোলা হয়।
এদিকে, সিটি এসবি’র দায়িত্বে থাকা ভারপ্রাপ্ত ডিআইজি মো. মুশফেকুর রহমানের সঙ্গে গণমাধ্যমকর্মীরা যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তাকে গ্রেফতারের দাবিতে July Revolutionary Alliance- JRA এর ফেসবুক পেজ থেকে পোস্ট করে বলা হয়েছে, R S Fahim Chowdhury সমাচার। নিজেকে বিপ্লবের পক্ষের দাবি করা এই ফাহিম বিগত সরকারের গণহত্যাকারী সবার সাথে ছিল আঁতাত। যারা প্রত্যেকে জুলাই গণহত্যার সাথে জড়িত। নানক এর পিএস সরাসরি গুলি চালিয়েছে , রাজিব সরাসরি নিজে গুলি চালিয়েছে। যাদের সাথে ফাহিম চলাফেরা করতো সবাই মাফিয়া, জঙ্গি, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী। ছেলেপেলে নিয়ে শোডাউন দিয়ে নেতাদের খুশি করতো ফাহিম। বসুন্ধরার আনভির এর জন্মদিনেও খুনি রাজিবের সাথে শো ডাউন দিয়েছিল। এই রাজিবের সাথেই কথোপকথনে জুলাইয়ে গুলি চালানো নিয়ে হাস্যরস করেছিল ফাহিম। জুলাইয়ে তার ভূমিকা তদন্তের বিষয়। তবে সে আওয়ামী সুবিধাভোগী এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহের অবকাশ নাই।
তিনি সহজেই দেশে ফেরায় ক্ষোভ প্রকাশ করে Private University Students Alliance of Bangladesh - PUSAB এর ফেসবুক পেজ থেকে পোস্ট করে বলা হয়েছে, RS Fahim Chowdhury নামের এইটারে নিয়ে এত আলোচনার কি আছে? এই বদমাইশটা একটা ছোট খাটো মাফিয়া। লীগের আমলে মোহাম্মপুদপুরের কুখ্যাত কাউন্সিলর রাজীব এবং আসিফের সাথে মিলে ত্রাস করে রেখেছিলো সে। রাজীব ছিল কুখ্যাত সন্ত্রাসী ও ক্যাসিনো মাফিয়া। আর আসিফকে তো জুলাইতে আমরা সরাসরি গুলি করতে দেখেছি। জুলাইতে যখন রাজীব আর আসিফ মিলে মোহাম্মাদপুরে গুলির উপর গুলি করে মানুষ হত্যা করছিলো, তখন এই আর এস ফাহিম উল্লাস করছিল, ব্যাঙ্গ করছিল। জুলাইতে মোহাম্মপুরে তার ছেলেপেলে লীগের হয়ে হামলায় অংশ নেয়। তার গ্যাং ও ছেলে পেলে অংশ নেয় হামলায়। শুধু তাই না, এই ফাহিম আর তৌহিদ আফ্রদী মিলেও জুলাইতে যারা ছাত্র-জনতার পক্ষে কথা বলতো তাদেরকে হুমকি ধামকি এবং ধরার ব্যাপারে সহযোগিতা করেছে। মোহাম্মপুর কিশোর গ্যাং এর জন্য কুখ্যাত! এই ফাহিম নিজেই বিশাল গ্যাং পালে। লীগের আমলে লীগের ছত্রছায়ায় তার চলাচলও ছিল মাফিয়া স্টাইলে। তার বাইকার কমিউনিটি, নিজেরর গ্যাং সব মিলে সে আইন ভঙ্গ করে অবৈধ ওয়াকিটকি নিয়ে বিশাল হাবভাবে চলতো। নিজের প্রভাব খাটিয়ে পুলিশ প্রশাসনেও তার ছিল যোগাযোগ। আইনের কোন তোয়াক্কাই করতো না এই ফাহিম ও তার গ্যাং। রাস্তা বন্ধ করে শোডাউন, তার গ্যাং কতৃক মানুষকে আক্রমণ, মোহামদ্দপুরে কাওন্সিলর রাজীবের অফিসে এনে নির্যাতন, জায়গা দখল, মারপিট হাজারো অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। উগ্র ছেলেপেলে নিয়ে সাজানো তার গ্যং ধরাকে সরা জ্ঞান করে সাধারন মানুষের উপর অত্যাচার করে লীগের আমল পার করেছে। তার পুরো সাম্রাজ্য দেখলে তাকে ছোট কোন মাফিয়াই মনে হবে। এই মাফিয়া দেশ থেকে পালিয়ে ছিল ইন্টেরিম সরকারের আমলে। বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ৭ দিনের মাথায় গতকাল সে রাজার হালে দেশে ফিরে এসেছে। এসেই শোডাউন দিয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে তাকে আসতে অভয় দিলো কে? মোহাম্মপুর ও ঢাকায় আবারও এই গ্যাং এর ত্রাস দেখতে হবে? জুলাইতে মানুষের উপর হামলা করে, লীগের আমলে মাফিয়া হয়ে চলা এই বদমাইশ কোন কারনে ফিরে আসলো?
গত বছর আরেক কনটেন্ট ক্রিয়েটর তৌহিদ আফ্রিদি গ্রেফতার হওয়ার পর আর এস ফাহিমকে গ্রেফতারের দাবিও ওঠে। এছাড়া ঢাকা-১৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানকের ঘনিষ্ঠ থাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
২০২৪ সালের আগস্টে একটি অডিও কল রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। সেখানে আর এস ফাহিমকে ফোনালাপে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীবের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালানোর বর্ণনা দিতে শোনা যায় বলে দাবি করা হয়। সেই অডিওতে তাকে হাসাহাসি করতেও শোনা গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, আর এস ফাহিমের দেশে ফেরা, তার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থান—সব মিলিয়ে বিষয়টি নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য না আসা পর্যন্ত অভিযোগগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত কিছু বলা যাচ্ছে না।