অর্থনীতি

বাণিজ্যের আড়ালে এক দশকে পাচার ৬৮৩০ কোটি ডলার


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৬, ১০:৫৩ এএম

বাণিজ্যের আড়ালে এক দশকে পাচার ৬৮৩০ কোটি ডলার
ছবি: সংগৃহীত

বাণিজ্য খাতকে ব্যবহার করে বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত এক দশকে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৬৮.৩০ বিলিয়ন ডলার (৬ হাজার ৮৩০ কোটি ডলার) পাচার হয়েছে। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী, যার পরিমাণ প্রায় ৮ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বেশি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৬.৮৩ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে, যা দেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ১৬ শতাংশের সমান। মূলত আমদানি-রপ্তানিতে মিথ্যা ঘোষণা বা মূল্য কারসাজির মাধ্যমে এই অর্থ বিদেশে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনীতি বিষয়ক শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্যে আরও বড় পরিসরের অর্থ পাচারের চিত্র উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে, যার পরিমাণ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে চলে গেছে।

এই অর্থ পাচারের সঙ্গে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, আর্থিক খাতের প্রভাবশালী ব্যক্তি, আমলা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের সম্পৃক্ততার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

দেশীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)-এর গবেষণায় দেখা গেছে, পাচার হওয়া অর্থের প্রায় ৭৫ শতাংশই বাণিজ্য খাতের মাধ্যমে ঘটে। আমদানি-রপ্তানিতে পণ্যের মূল্য কম বা বেশি দেখিয়ে এই অর্থ বিদেশে স্থানান্তর করা হয়।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ২০১৫ সালের অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইন সংশোধনের পর চিহ্নিত ৯৫টি ঘটনার সবগুলোই বাণিজ্য চ্যানেলের মাধ্যমে সংঘটিত হয়েছে, যার মোট পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ২০১ কোটি টাকা।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত শুধুমাত্র মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে প্রতিবছর গড়ে ৮.২৭ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। আর ২০০৯-২০২৩ সময়ে এই সংখ্যা গড়ে বছরে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা দেশের জিডিপির উল্লেখযোগ্য অংশ।

জিএফআই-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, উন্নয়নশীল এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অর্থ পাচারের ঝুঁকিতে থাকা শীর্ষ দেশগুলোর একটি। পাচার হওয়া অর্থের বড় অংশ উন্নত দেশগুলোতে চলে যাচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতি ও সুশাসনের জন্য বড় হুমকি।

এর ফলে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ দুর্বল হচ্ছে, কর আদায় কমছে এবং জনসেবা ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের সক্ষমতা কমে যাচ্ছে।

প্রতিবেদনগুলোতে অর্থ পাচার রোধে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করা হয়েছে- শুল্ক ব্যবস্থাপনা জোরদার করা, আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময় বৃদ্ধি, মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা ও ব্যাংকিং খাতে নজরদারি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাণিজ্যভিত্তিক অর্থ পাচার বন্ধে কঠোর নজরদারি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো ছাড়া এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।