বিনোদন

উত্তরাঞ্চলের ভাওয়াইয়া গানের শিল্পী অনন্ত কুমার দেব মারা গেছেন


বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:২৪ পিএম

উত্তরাঞ্চলের ভাওয়াইয়া গানের শিল্পী অনন্ত কুমার দেব মারা গেছেন
অনন্ত কুমার দেব। ছবি: সংগৃহীত

উত্তরাঞ্চলের ভাওয়াইয়া গানের অন্যতম প্রধান ধারক ও বাহক, শিল্পী ও গবেষক অনন্ত কুমার দেব আর নেই। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার রাত সাড়ে ১১টায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার প্রয়াণে কুড়িগ্রামসহ পুরো উত্তরাঞ্চলের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোক।

অনন্ত কুমার দেব ছিলেন ভাওয়াইয়া গানের একজন নিবেদিতপ্রাণ সাধক। শিল্পী হিসেবে যেমন তিনি পরিচিত ছিলেন, তেমনি ছিলেন গবেষক, গীতিকার, সুরকার, প্রযোজক ও শিক্ষক। বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের নিয়মিত ও বিশেষ গ্রেডের শিল্পী হিসেবে তিনি চার দশকের বেশি সময় ধরে লোকসংগীতকে তুলে ধরেছেন জাতীয় পরিসরে।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়নের দেবালয় গ্রামে জন্ম নেওয়া এই গুণী মানুষটি ভাওয়াইয়া, পালাগান, কুশানগান ও দোতরা গানকে লালন করেছেন অন্তরের গভীরে। বিলুপ্তপ্রায় লোকসংগীত সংগ্রহ ও সংরক্ষণে ছিল তার আজীবনের সাধনা। এসব গান সংকলনের জন্য তিনি পান্ডুলিপি প্রস্তুত করেন, যা লোকসংগীত গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে বিবেচিত।

“ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দেরে” গানটির মাধ্যমে তিনি বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন। শিষ্য ও অনুরাগীদের কাছে তিনি পেয়েছিলেন ‘ভাওয়াইয়া মুকুট’ উপাধি—যা তার প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধারই প্রতিফলন।

শুধু সংগীতেই নয়, আঞ্চলিক সাহিত্যেও ছিল তার স্বতন্ত্র উপস্থিতি। ‘ধরলা পাড়ের গল্প’ ও ‘জ্যাঠোর ফ্যাদলা’ শিরোনামে আঞ্চলিক ভাষায় লেখা রম্য কলাম তাকে পাঠকমহলে জনপ্রিয় করে তোলে। পালা ও কুশান গানের রসিক দোহার হিসেবেও তিনি মানুষের ভালোবাসা কুড়িয়েছেন।

স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মী নয়ন ও শাওন বলেন, “অনন্ত কুমার দেব ছিলেন একজন সব্যসাচী লোক। জেলা ও উত্তরবঙ্গের একজন স্বনামধন্য মানুষকে আমরা হারালাম। তিনি শুধু দেশেই নয়, দেশের বাইরেও সুনাম কুড়িয়েছেন।”

ভাওয়াইয়া শিল্পী শফি ও মদন মোহন জানান, “ভাওয়াইয়া মুকুট অনন্ত কুমার দেব আমাদের গর্ব। তিনি আমাদের জন্য একটি বড় দায়িত্ব রেখে গেলেন। আমরা তার ছাত্র-ছাত্রীরা সবাই মিলে ভাওয়াইয়াকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবো।”

রংপুর অঞ্চলের বিশিষ্ট গবেষক ও ভাওয়াইয়া শিল্পী খ. ম. আলী সম্রাট বলেন, “তিনি ছিলেন লোকসংগীতের এক কিংবদন্তি। তার অবর্তমানে যে শূন্যতা তৈরি হলো, তা পূরণ হওয়া কঠিন।”

রংপুর বেতারের আঞ্চলিক পরিচালক আবদুর রহিম জানান, “চার যুগের বেশি সময় ধরে তিনি বেতার ও টেলিভিশনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার প্রয়াণে ভাওয়াইয়া অঙ্গনে অপূরণীয় ক্ষতি হলো।”

একজন মানুষের চলে যাওয়া মানেই শুধু একটি জীবনাবসান নয়—অনন্ত কুমার দেবের ক্ষেত্রে তা একটি সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি। তার কণ্ঠ, গবেষণা ও সাধনা উত্তরাঞ্চলের লোকসংগীতে চিরকাল বেঁচে থাকবে।