ফিচার
রমনার গাছগুলো কি সবকিছু মনে রাখে?
ঢাকার কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা রমনা পার্ক কেবল একটি পার্ক নয়—এ যেন সময়ের দীর্ঘশ্বাসে শেকড় গেড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক নিঃশব্দ ইতিহাস। শতবর্ষী এই গাছগুলো ছায়া দেয় ঠিকই, কিন্তু তারা শুধু ছায়া দেয় না—তারা দেখে, তারা শুনে, তারা মনে রাখে।
শহরের রক্তগরম আন্দোলনের দিনগুলো হোক কিংবা ভাঙা হৃদয়ের নীরব কান্না—এই গাছগুলো সব জানে, সব টের পায়, সব গিলে ফেলে নীরবে।
প্রতিটি গাছ যেন একেকটি পুরোনো মানুষ, যার শরীরের গুঁড়িতে লেগে আছে স্মৃতির ধুলো। তারা দেখেছে ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনের প্রভাতফেরি, শুনেছে উচ্চারিত ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগান। তাদের পাতার ফাঁকে ফাঁকে আজও গুনগুন করে বাজে সেই প্রতিবাদী কণ্ঠ। তারা দেখেছে ৭১-এর রক্তাক্ত দিন, দেখেছে কিভাবে মানুষের মুখে মুখে ফিরে ফিরে এসেছে “জয় বাংলা”র ধ্বনি। আর তারা চুপ করে থেকেছে যখন ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে উঠেছে হাজার মানুষের মিছিল—হয়তো ভেতরে ভেতরে তারা হেলেছিল, শেকড় আর কাণ্ড দিয়ে গর্জে উঠেছিল মানুষের সাথে।
এই গাছগুলো শুধু দেশের ইতিহাস নয়, মানুষের ব্যক্তিগত ইতিহাসও আগলে রেখেছে পরম মমতায়। একদিন এক বৃদ্ধ এলেন ধীরে ধীরে হেঁটে, হাতের কাঁপা আঙুলে ধরা ছিল পুরোনো এক চিঠি। তিনি চুপচাপ বসে ছিলেন সেই বেঞ্চটায়, যেন কারও জন্য অপেক্ষা করছেন—হয়তো যিনি আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না। গাছগুলো তাকিয়েছিল, চুপচাপ রেখেছিল তাদের ছায়া, জানতো অপেক্ষার চেয়ে ধৈর্যবান আর কিছু নেই।
তারা দেখেছে প্রথম ভালোবাসার হাত ধরা, প্রথম ভাঙনের মুখরতা। একদিন দুটি কিশোর-কিশোরী এসে বসেছিল পাশাপাশি, ভাগ করে নিয়েছিল একটি চকলেট আর একটি স্বপ্ন। কয়েক সপ্তাহ পর, মেয়েটি একাই ফিরে এসেছিল, চোখে ছিল কিছুটা লুকানো পানি আর খুব সাবধানে রাখা দুঃখ। গাছগুলো জানতো, ভালোবাসা যেমন আসে, তেমনি নিঃশব্দে চলেও যায়—শুধু কিছু না-বলা কথা ফেলে রেখে যায় পাতার ফাঁকে।
রমনার ছায়ায় প্রতিদিন কেউ না কেউ এসে বসে—কেউ কবিতা লেখে, কেউ গান গায় মনের মধ্যে, কেউ চুপচাপ বসে থাকে শুধু নিজের নিঃশ্বাসটা শুনতে। কারও মুখে হাসি, কারও ভেতরে ভাঙা। গাছগুলো কিছুই বলে না, কিন্তু ঠিক পাশে বসে থাকে। মানুষের মতো তাদের কোনো শব্দ নেই, কোনো অভিযোগ নেই, তবু তারা মানুষকেই ভালো বোঝে। কে শূন্য হয়ে গেছে, কে আবার নতুন করে বাঁচতে শিখছে—সব তারা অনুভব করে।
এই ছায়ার নিচে দেখা যায় এক কিশোর ফুল বিক্রেতাকে, যার হাতে গাঁদা, রজনিগন্ধা আর কিছু গোলাপ। সে প্রতিদিন আসে, হয়তো স্কুলে যাওয়ার সময় বা সুযোগ নেই, কিন্তু পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে ফুল নিয়ে আসে রমনায়। কেউ তার ফুল হাসিমুখে নেয়, কেউ ফিরিয়ে দেয় অবহেলায়—তবু সে আসে, নিরলসভাবে। আরেক কোণে মাঝে মাঝে শোনা যায় এক বৃদ্ধ খবর বিক্রেতার কণ্ঠ, “বিশেষ সংখ্যা, পড়ে দেখুন!”—তাঁর কণ্ঠ কখনও চাপা পড়ে যায় শহরের কোলাহলে, কিন্তু গাছগুলো শুনে। তারা চুপচাপ তাকিয়ে থাকে, জানে এই মানুষগুলোও ইতিহাসের অংশ—অন্য একধরনের নায়ক, যাদের গল্প খুব একটা লেখা হয় না কোথাও।
তাই রমনার গাছগুলো নিছক বৃক্ষ নয়। তারা ইতিহাসের নীরব সাক্ষী, আন্দোলনের সহযাত্রী, ভালোবাসার সাথী, একাকিত্বের শ্রোতা। তারা হয়তো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু তাদের ডালপালা ছড়িয়ে আছে শহরের প্রতিটি স্মৃতিতে। যেখানে আমরা ভুলে যাই, সেখানে তারা মনে রাখে। আমরা যখন চলে যাই, তারা থেকে যায়—স্মৃতি হয়ে, ছায়া হয়ে, অথবা নিঃশব্দে পাশে বসে থাকা কোনো প্রিয়জনের মতো।
লেখক : মারুফা জাহান মুমু
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি