ফিচার
তিন চাকার ক্যানভাসে রঙিন শিল্প
ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায়, গাড়ির হর্নের শব্দ আর কোলাহলপূর্ণ ভিড়ের শব্দে কিছু আলাদাই নজর কাড়ে "রিকশা"। রিকশা দাঁড়িয়ে থাকে বিশেষ এক ভঙ্গিতে। এটি কেবল যানবাহন হওয়ার কারণে নয়, তাদের পিঠে রঙিন পেইন্টিংগুলির কারণেও যা প্রায়শই মানুষকে থামতে এবং ঘনিষ্ঠভাবে দেখতে বাধ্য করে। প্রতিটি চিত্রকর্ম একটি চলমান আর্ট গ্যালারির মতো একটি গল্প বলে। আর এ গল্পগুলো যেন দেশি, বিদেশি সকল মানুষকেই মুগ্ধ করে।
রিকশা পেইন্টিং বাংলাদেশের লোকশিল্পের একটি সুন্দর নিদর্শন। এই শিল্প ফর্মটি ১৯৫০-এর দশকে শুরু হয়েছিল। প্রথমে ফুল, পাখি, গ্রামীণ দৃশ্য বা ধর্মীয় মোটিফ দিয়ে সাজানো হতো রিকশা। সময়ের সাথে সাথে চলচ্চিত্র তারকা, ক্রিকেটার, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং এমনকি সামাজিক বার্তাগুলির চিত্রগুলি তাদের জায়গা পেয়েছে। এভাবেই রিকশা হয়ে ওঠে চলন্ত ক্যানভাস, আর শিল্পীরা হয়ে ওঠেন নীরব স্রষ্টা, নীরবে রাস্তায় রঙ ছড়ানোর শিল্পী যেন এরা।
একসময় ঢাকার প্রায় প্রতিটি রিকশাই হাতে রং করা হতো। এ যেন এক প্রতিযোগিতা—কার রিকশা দেখতে সবচেয়ে কত সুন্দর, কতটা নজরকাড়া; এ নিয়েই যেন এক প্রতিযোগিতা চলতো। একজন অভিজ্ঞ রিকশা শিল্পী দিনে ২-৩টি রিকশা আঁকতে পারতেন। আর এভাবেই তারা জীবিকাও নির্বাহ করে, কাটিয়ে দিত তাদের সাদামাটা জীবনকে।
কিন্তু এখন সেই দৃশ্যপট অনেকটাই পাল্টে গেছে। ডিজিটাল স্টিকার, সস্তা প্রিন্টেড ডিজাইন এবং সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলার প্রয়োজনীয়তা এই লোকশিল্পকে ধীরে ধীরে অদৃশ্য করে দিচ্ছে। অনেক শিল্পীকে পেশা পরিবর্তন করতে হয়েছে সময়ের তাগিদে। শিল্পীর তুলির জায়গা দখল করে নিয়েছে যন্ত্র।
বিশিষ্ট গবেষক শামসুজ্জামান খান এই শিল্পকে "শহুরে লোকশিল্প" বলে অভিহিত করেছেন, যেখানে মানুষের চিন্তা, রুচি এবং সময়ের প্রভাব একত্রিত হয়। এ যেন 'পপ কালচারের' প্রতিচ্ছবি।
রিকশা পেইন্টিং শুধু সাজসজ্জা নয়; এটি মানুষের অনুভূতি, চিন্তা প্রকাশ করার একটি উপায়। এখানে এক শিল্পী লেখেন ভালোবাসার বাণী, তো অন্য শিল্পী দেখান ধর্মীয় অনুপ্রেরণা, আবার কেউ রিকশার পিঠে বসেই যেন নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা আঁকেন।
আজ যখন আমরা লোকসংস্কৃতির কথা বলি, তখন এই শিল্পীদের ভুলে গেলে চলবে না। তাদের রঙিন তুলি দিয়ে তারা রিকশাকে কল্পনার চলমান জগতে পরিণত করেছিল - যেখানে বাস্তবতা, রূপকথা এবং রঙ সব একসাথে বিচরণ করে। আর এটাই হয়তো রঙ, তুলির খেলা।
তবে আশার কথা হলো, এই হারিয়ে যাওয়া শিল্প আবারও ফিরে আসছে নতুন রূপে। বর্তমানে অনেক তরুণ শিল্পী রিকশা পেইন্টিংকে ঘিরে নতুন ভাবনা ও উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসছেন। কারও জন্য এটি শুধুই শিল্পচর্চা নয়, বরং জীবিকার পথও হয়ে উঠছে। বিভিন্ন প্রদর্শনী, ডিজাইন ব্র্যান্ড, এমনকি আন্তর্জাতিক আর্ট প্ল্যাটফর্মেও রিকশা পেইন্টিং এখন স্থান করে নিচ্ছে। রিকশার পিঠে আঁকা সেই গল্পগুলো তাই আবারও নতুন প্রজন্মের হাতে ফিরে পাচ্ছে প্রাণ – এইবার আরও গর্বের সাথে, আরও বিস্তৃত পরিসরে।
লেখক : মারুফা জাহান মুমু
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি