সারাবিশ্ব

সামরিক চাপ কমালেই ৭ দিনের মধ্যে হরমুজ খুলবে ইরান, যুক্তরাষ্ট্রকে শর্ত


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:২৮ পিএম

সামরিক চাপ কমালেই ৭ দিনের মধ্যে হরমুজ খুলবে ইরান, যুক্তরাষ্ট্রকে শর্ত
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে শর্ত দিয়েছে ইরান। তেহরানের দাবি, ওয়াশিংটন সামরিক চাপ কমানোর পাশাপাশি ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত অবরোধ প্রত্যাহার করলে মাত্র সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে প্রস্তুত তারা।

জাপানের কিয়োদো নিউজ ও বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া পৃথক বক্তব্যে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন। তবে দুই সংবাদমাধ্যমকে বক্তব্য দেওয়া কর্মকর্তারা একই ব্যক্তি কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। কিয়োদো নিউজ প্রথম এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

কিয়োদোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে থাকা আলোচনা পুনরায় শুরু করতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে তেহরান। ইরানের প্রস্তাবটি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ওয়াশিংটনের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা।

ইরানের প্রস্তাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ কমানোর ক্ষেত্রে প্রাথমিক ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিলে তেহরান এক সপ্তাহের মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিতে পারে। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের শত্রুতার স্থায়ী অবসানের লক্ষ্যে নতুন করে আলোচনা শুরুর প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।

জাতিসংঘ অধিবেশনকে কূটনীতির সুযোগ হিসেবে দেখছে ইরান

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিতে যাওয়া ইরানি প্রতিনিধিদলকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করার জন্য পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

ইরানি ওই কর্মকর্তা বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কূটনীতির পথে ফিরে আসার একটি ‘সুবর্ণ সুযোগ’। তবে তেহরান আলোচনায় ফিরতে প্রস্তুত থাকলেও ওয়াশিংটনকে নিজেদের আগ্রহের পক্ষে ‘বাস্তব ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ’ নিতে হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

ইরানের পক্ষ থেকে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রস্তাব পৌঁছে দেওয়ার কথা জানিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, নতুন করে আলোচনা শুরুর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যকার চলমান উত্তেজনা ও শত্রুতার স্থায়ী অবসানের পথ খুঁজে বের করাই তেহরানের লক্ষ্য।

বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যে হরমুজের গুরুত্ব

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহণপথ। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগকারী এই নৌপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল, তেলজাত পণ্য ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিবহণ করা হয়।

রয়টার্সের প্রাথমিক জাহাজ চলাচল-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, চলমান সংঘাতের আগে প্রতিদিন প্রায় ১২৫টি বড় বাণিজ্যিক জাহাজ-এর মধ্যে তেলবাহী ট্যাংকার ও গ্যাসবাহী জাহাজও রয়েছে-হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করত। কিন্তু সোমবার সেই সংখ্যা কমে মাত্র দুটি জাহাজে নেমে আসে।

দীর্ঘ সময় ধরে প্রণালিটির কার্যত বন্ধ থাকা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহণ হয়ে থাকে। ফলে এই নৌপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ও দামের ওপর দ্রুত প্রভাব পড়ে।

ইরানের নতুন প্রস্তাবের খবর প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক তেলবাজারেও এর তাৎক্ষণিক প্রভাব দেখা যায়। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, খবরটি প্রকাশের পর ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ১ শতাংশ কমে যায়। বাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন করে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় এই মূল্য কমার ঘটনা ঘটে।

যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের অপেক্ষায় তেহরান

ইরানের প্রস্তাবের কেন্দ্রীয় শর্ত দুটি-যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক চাপ কমাতে হবে এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত অবরোধ প্রত্যাহার করতে হবে। এসব পদক্ষেপ নেওয়া হলে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়ে অগ্রসর হতে প্রস্তুত তেহরান।

কিয়োদোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সৃষ্ট সংকটের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্থবির হয়ে থাকা কূটনৈতিক আলোচনা আবার শুরু করা।

এর আগে চলতি বছরের জুনেও হরমুজ প্রণালি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার একটি প্রচেষ্টা হয়েছিল। সে সময় আলোচনায় থাকা একটি প্রস্তাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করলে ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার কথা ছিল।

তবে পরবর্তী সময়ে সংঘাত এবং দুই পক্ষের পারস্পরিক সামরিক পদক্ষেপের কারণে সেই কূটনৈতিক উদ্যোগ আর এগোয়নি। এখন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে সামনে রেখে ইরানের নতুন প্রস্তাব দুই দেশের মধ্যে আবারও আলোচনার একটি সম্ভাব্য পথ তৈরি করেছে।

তবে তেহরানের এই প্রস্তাবে ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়া কী হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ ও অবরোধের বিষয়ে কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় কি না এবং দুই দেশ নতুন করে আলোচনায় বসে কি না-তার ওপরই হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি অনেকটা নির্ভর করছে।