সারাবিশ্ব
৭ দিনের মধ্যে হরমুজ খোলার খবর ‘ভিত্তিহীন’, দাবি ইরানের
৭ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইরান কোনও সিদ্ধান্ত নেয়নি বলে দাবি করেছে দেশটির সূত্রগুলো। যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ কমিয়ে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ তুলে নিলে এক সপ্তাহের মধ্যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে-এমন খবর প্রকাশের পর তা প্রত্যাখ্যান করেছে ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজ। ইরানি সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে ফার্স নিউজ জানিয়েছে, এ ধরনের কোনও সিদ্ধান্ত তেহরান নেয়নি এবং প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো সঠিক নয়।
এর আগে মঙ্গলবার রয়টার্স ও জাপানের কিয়োদো নিউজ পৃথক প্রতিবেদনে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ কমালে এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ তুলে নিলে হরমুজ প্রণালি সাত দিনের মধ্যে পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে তেহরান প্রস্তুত। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সামরিক চাপ কমানোর পাশাপাশি ইরানি বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ প্রত্যাহার করা হলে প্রণালিটি পুনরায় চালুর সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এই খবর প্রকাশের পরই ইরানের পক্ষ থেকে তা নিয়ে আপত্তি আসে। ফার্স নিউজের প্রতিবেদনে ইরানি সূত্রগুলো জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপ কমানো ও বন্দর অবরোধ তুলে নেওয়ার বিনিময়ে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ খুলে দেওয়ার কোনও সিদ্ধান্ত তেহরান নেয়নি। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ সূত্রের বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
তেলের বাজারেও পড়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব। হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার সম্ভাবনার খবর প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে যায়। বাজারে এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল যে, প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে চাপ কিছুটা কমতে পারে। বিভিন্ন বাজার প্রতিবেদনে দেখা যায়, হরমুজ নিয়ে সম্ভাব্য সমঝোতার খবর তেলের দামে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।
ফার্স নিউজের প্রতিবেদনে ইরানি সূত্রগুলো এ ধরনের খবর প্রকাশের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়েও সতর্ক করেছে। তাদের বক্তব্য, ইরানি কর্মকর্তাদের বক্তব্য বা সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের বিষয়ে এমন খবর প্রকাশিত হলে তা আন্তর্জাতিক তেলবাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করতে পারে। এর ফলে তেলের দামেও দ্রুত ওঠানামা হতে পারে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের অবস্থান অবশ্য নতুন নয়। এর আগেও তেহরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপ, অবরোধ ও অন্যান্য শর্তের পরিবর্তন না হলে প্রণালিটি পুরোপুরি স্বাভাবিক করার বিষয়ে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নয়। আগস্টেও ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহার, তেলবিষয়ক নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং সামরিক হুমকি ও অভিযান বন্ধসহ নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ পুনরায় খোলার বিষয়ে অগ্রগতি হবে না।
সেপ্টেম্বরের শুরুতেও ইরানের এক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি ও হামলা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালির পূর্ণাঙ্গভাবে খোলা নিয়ে তেহরান প্রতিশ্রুতি দেবে না। একই সময়ে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচল নিয়ে নতুন বিধিনিষেধ ও করিডোরের কথাও জানিয়েছিল।
বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে সংযুক্ত করা এই সরু নৌপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল, তেলজাত পণ্য ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি পরিবহন করা হয়। ফলে এখানে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ, পরিবহন ব্যয় এবং তেলের বাজারে দ্রুত প্রভাব পড়তে পারে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও এলএনজি পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে যেত বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনা নিয়েও নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। রয়টার্স জানিয়েছে, উভয় পক্ষই সংঘাতের অবসান ও আলোচনায় ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে কিছুটা ইঙ্গিত দিয়েছে।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালি সাত দিনের মধ্যে খুলে দেওয়ার বিষয়ে এখন পর্যন্ত পরস্পরবিরোধী তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। রয়টার্স ও কিয়োদোর প্রতিবেদনে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে সম্ভাব্য প্রস্তাবের কথা বলা হলেও ফার্স নিউজের মাধ্যমে ইরানি সূত্রগুলো সেই খবরকে ভিত্তিহীন ও অসত্য বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে তেহরান আনুষ্ঠানিকভাবে হরমুজ পুনরায় খোলার বিষয়ে কোনও নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী ইরানি ঘোষণা ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়াই পরিস্থিতির পরবর্তী দিক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।