সারাবিশ্ব
রিয়াদে ফের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, সৌদি আরবজুড়ে আতঙ্ক; আহত ৪
ইয়েমেনের রাজধানী সানায় হুতি বিদ্রোহীদের ঘাঁটি ও বিভিন্ন স্থাপনায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলার জবাবে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদসহ বিভিন্ন স্থানে ফের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা। পাল্টাপাল্টি হামলায় সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যে সংঘাত নতুন করে তীব্র আকার ধারণ করেছে। পরিস্থিতি ঘিরে সৌদি আরবে নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রাজধানী রিয়াদকে লক্ষ্য করে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। বুধবারও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এর আগে মঙ্গলবার রাতে রিয়াদের আকাশে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার তৎপরতা এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দৃশ্য দেখা যায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
সংবাদমাধ্যম ও প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী, রিয়াদের একটি প্রধান সড়কের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এক ব্যক্তি আকাশে আলোর ঝলকানি ও ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখতে পান। একটি শপিং সেন্টারের ওপর দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্রসদৃশ বস্তু ছুটে যাওয়ার পর বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এ সময় সড়কে থাকা অনেক মানুষ আতঙ্কিত হয়ে যানবাহন থামিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন।
বুধবার রিয়াদে সম্ভাব্য আকাশপথের হুমকি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মোবাইল ফোনে জরুরি সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। বার্তায় নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হলেও কয়েক মিনিট পর সতর্কতা প্রত্যাহার করা হয়। সৌদি প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, রিয়াদে দুটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার পর সেগুলোর ধ্বংসাবশেষ নিচে পড়ে দুই নারী, এক পুরুষ ও এক শিশুসহ চারজন আহত হন। এ ঘটনায় প্রায় ১৫টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।
এদিকে, সৌদি আরবের জাহরানে রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকোর সদর দপ্তর কমপ্লেক্সের একটি ভবনে মঙ্গলবার হামলার ঘটনা ঘটে। সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, হামলার পর সেখানে সামান্য অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেও কেউ হতাহত হননি। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোকে ঘিরে এ ধরনের হামলা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
হুতিদের হামলার জবাবে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট পশ্চিম ইয়েমেনের একাধিক তেল স্থাপনায় বিমান হামলা চালিয়েছে। জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি জানান, হুতিদের সামরিক কার্যক্রমে জ্বালানি সরবরাহ এবং লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদাব প্রণালির আন্তর্জাতিক নৌপথের জন্য হুমকি তৈরি করতে ব্যবহৃত স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে অভিযান চালানো হয়েছে।
সানায় বিমান হামলার পর স্থানীয় তেল কোম্পানিগুলোর কার্যালয় ও বিভিন্ন স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে রাজধানী সানা ও আশপাশের এলাকায় জ্বালানি সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কায় পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
চলমান সংঘাতের সূত্রপাত নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শনিবার রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হুতিদের একটি প্রাণঘাতী হামলার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ওই হামলায় ১৩ জন নিহত হন এবং বিমানবন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৫ সালে ইয়েমেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সৌদি ভূখণ্ডে এটিকে অন্যতম ভয়াবহ হামলা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
এ ঘটনার পর সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে দেশের নিরাপত্তা এবং লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদাব প্রণালিতে অবাধ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানানো হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, দেশটির নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক নৌপথের স্বাধীন চলাচলের ওপর কোনো ধরনের হুমকি মেনে নেওয়া হবে না।
এদিকে, পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় বেশ কয়েকটি দেশ সৌদি আরবে অবস্থানরত নিজেদের নাগরিকদের জন্য ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে। ফ্রান্স সরকার নাগরিকদের রিয়াদ, জেদ্দা ও দাম্মাম বিমানবন্দর এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় রিয়াদের সব স্কুলে অনলাইন ক্লাস চালু করা হয়েছে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের ঘরে বসে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে। এর ফলে সাধারণত যানজটে ব্যস্ত থাকা রাজধানীর সড়কগুলোতে যানবাহনের উপস্থিতি কমে এসেছে।
সৌদি আরব ও হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত থাকায় আঞ্চলিক নিরাপত্তা, জ্বালানি অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, তা নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ আন্তর্জাতিক মহলে নজর রাখা হচ্ছে।