সারাবিশ্ব

বাংলাদেশ মিশন ঘিরে ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের তাণ্ডব


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৯:৪৮ এএম

বাংলাদেশ মিশন ঘিরে ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের তাণ্ডব
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক বর্তমানে চরম উত্তেজনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। স্মরণকালের মধ্যে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে এমন তিক্ততা খুব কমই দেখা গেছে। ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর সহিংস বিক্ষোভ, হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং কূটনীতিকদের হত্যার হুমকির মতো ঘটনা উদ্বেগজনক মাত্রা ধারণ করেছে। এসব ঘটনা নজিরবিহীন ও পূর্বপরিকল্পিত বলে মনে করছে বাংলাদেশ সরকার।

এ পরিস্থিতির প্রতিবাদ জানিয়ে মঙ্গলবার ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে তলব করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তলবকালে নয়াদিল্লি, কলকাতা ও শিলিগুড়িতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক স্থাপনায় সংঘটিত হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এসব ঘটনাকে কেবল কূটনৈতিক কর্মীদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, শান্তি ও সহনশীলতার পরিপন্থী বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

মঙ্গলবার দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) ও বজরং দলের শত শত কর্মী বিক্ষোভে অংশ নেয়। বিক্ষোভ চলাকালে বাংলাদেশবিরোধী উসকানিমূলক স্লোগান দেওয়া হয় এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়। বিক্ষোভকারীরা কূটনৈতিক এলাকার দিকে অগ্রসর হলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিক্ষোভকারীরা অন্তত দুটি ব্যারিকেড ভেঙে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যরা বাধা দেন। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি ও সংঘর্ষ শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে আটক করে এবং পরে হাইকমিশনের চারপাশে পুনরায় ব্যারিকেড বসিয়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।

একই দিন কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশনের সামনেও বিক্ষোভ করে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো। বঙ্গীয় হিন্দু জাগরণ মঞ্চের ডাকে শিয়ালদহ রেলস্টেশন থেকে শুরু হওয়া মিছিলটি ডেপুটি হাইকমিশনের দিকে অগ্রসর হলে বেগবাগান এলাকায় পুলিশ তাদের আটকে দেয়। প্রথম ব্যারিকেড ভাঙার পর বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধস্তাধস্তি শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিচার্জ করলে কয়েকজন বিক্ষোভকারী ও পুলিশ সদস্য আহত হন। পরে একাধিক বিক্ষোভকারীকে আটক করে কলকাতা পুলিশের সদর দপ্তর লালবাজারে নেওয়া হয়।

এছাড়া সোমবার পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়িতে অবস্থিত বাংলাদেশ ভিসা সেন্টারে হামলা চালায় উগ্রবাদী গোষ্ঠী। প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার বিক্ষোভকারী সেখানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এ ঘটনার পর ভিসা সেন্টারের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, মঙ্গলবার সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়ামের দপ্তরে প্রবেশ করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই মন্ত্রণালয় ত্যাগ করেন। বৈঠকে বাংলাদেশ সরকার ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশন ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারত সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানায়।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক রীতিনীতি অনুযায়ী কূটনৈতিক কর্মী ও স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা রক্ষা করা স্বাগতিক দেশের দায়িত্ব। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সাম্প্রতিক হামলাগুলোর নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রত্যাশা করেছে বাংলাদেশ।

উল্লেখ্য, গত শনিবার রাতে দিল্লিতে বাংলাদেশ হাউসের সামনে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং বাংলাদেশি হাইকমিশনারকে হত্যার হুমকির পর থেকেই ঢাকা–দিল্লি সম্পর্ক দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। ধারাবাহিক এসব ঘটনার প্রতিবাদে বাংলাদেশ হাইকমিশন ইতোমধ্যে ভারতীয় নাগরিকদের জন্য অনির্দিষ্টকালের জন্য ভিসা সেবা বন্ধ রেখেছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, কূটনৈতিক মিশন ঘিরে সহিংসতার এই ধারা দুই দেশের সম্পর্ককে স্মরণকালের সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় নিয়ে গেছে।