সারাবিশ্ব

বেঁচে থাকার তাগিদে আফগান পিতারা সন্তান বিক্রি করছে: বিবিসি


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬, ১১:১৯ এএম

বেঁচে থাকার তাগিদে আফগান পিতারা সন্তান বিক্রি করছে: বিবিসি
ছবি: সংগৃহীত

তালেবান শাসিত আফগানিস্তানে ক্রমেই গভীর হচ্ছে মানবিক সংকট। চরম দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও খাদ্যাভাবের কারণে অনেক পরিবার এখন সন্তানদের বিক্রি করার মতো মর্মান্তিক সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমনই ভয়াবহ বাস্তবতা।

দেশটির ঘর প্রদেশের রাজধানী চাঘচারানে প্রতিদিন ভোরে কাজের আশায় জড়ো হন শত শত শ্রমজীবী মানুষ। তবে অধিকাংশ দিনই কাজ মেলে না। ফলে পরিবারে খাবার জোগাড় করাই হয়ে উঠেছে বড় চ্যালেঞ্জ।

স্থানীয় বাসিন্দা জুমা খান জানান, গত ছয় সপ্তাহে তিনি মাত্র তিন দিন কাজ পেয়েছেন। তাতেও দিনে আয় হয়েছে ১৫০ থেকে ২০০ আফগানি। তার ভাষায়, টানা কয়েক রাত সন্তানদের না খেয়ে ঘুমাতে হয়েছে। খাবারের জন্য শেষ পর্যন্ত প্রতিবেশীর কাছে ধার চাইতে বাধ্য হন তিনি।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, আফগানিস্তানে প্রতি চারজনের মধ্যে তিনজন বর্তমানে মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। একই সঙ্গে বেকারত্ব, স্বাস্থ্যসেবা সংকট ও আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। প্রায় ৪৭ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

ঘর প্রদেশের আরেক বাসিন্দা রাবানি বলেন, সন্তানদের অনাহারে থাকার খবর তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছে। একপর্যায়ে আত্মহত্যার কথাও ভেবেছিলেন তিনি। তবে পরিবারের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন।

একই অঞ্চলের খোয়াজা আহমদ জানান, বয়স বেশি হওয়ায় কাজ পাচ্ছেন না। এরই মধ্যে তার বড় সন্তান মারা গেছে। এখন বাকি সন্তানদের বাঁচাতে কাজের জন্য প্রতিদিন সংগ্রাম করতে হচ্ছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু এলাকায় মাঝে মাঝে দরিদ্রদের শুকনো রুটি দেওয়া হলেও তা মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায়। একটি শ্রমিকের কাজের জন্য অল্প সময়েই শতাধিক মানুষ ভিড় করছেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ঘরের আশপাশের গ্রামগুলোতে দারিদ্র্যের চাপে সন্তান বিক্রির ঘটনা বাড়ছে। আবদুল রশিদ আজিমি নামের এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, ঋণের বোঝা ও অভাবের কারণে তিনি দুই মেয়েকে বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার দাবি, একটি মেয়েকে বিক্রি করতে পারলে কয়েক বছরের খাবারের ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে।

তার স্ত্রীর ভাষায়, পরিবারে প্রতিদিনের খাবার বলতে মূলত রুটি ও গরম পানি।

স্থানীয়দের মতে, আফগান সমাজে ছেলেদের ভবিষ্যতের উপার্জনক্ষম সদস্য হিসেবে দেখা হয়। অন্যদিকে তালেবান শাসনে মেয়েদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হয়ে যাওয়ায় মেয়েশিশু বিক্রির প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে।

এমনই আরেক ঘটনায় সাঈদ আহমদ নামে এক ব্যক্তি জানান, চিকিৎসার খরচ বহন করতে না পেরে তিনি তার পাঁচ বছরের মেয়েকে ২ লাখ আফগানির বিনিময়ে এক আত্মীয়ের কাছে দিয়েছেন। ভবিষ্যতে মেয়েটিকে ওই পরিবারের ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার শর্তও রয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়া, দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকট, খরা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা মিলিয়ে আফগানিস্তানের মানবিক পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে উঠেছে। স্বাস্থ্য খাতেও দেখা দিয়েছে ভয়াবহ সংকট। হাসপাতালগুলোতে ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি বাড়ছে, পাশাপাশি অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ফলে অনেক পরিবার এখন এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে সন্তানকে বাঁচানো আর অভাবের চাপে তাকে বিক্রি করে দেওয়ার মধ্যে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।