সারাবিশ্ব
ঘুমন্ত যাত্রীদের মধ্যে হঠাৎ আগুন, গ্রেটার নয়ডায় স্লিপার বাসে নিহত ৯
ভারতের উত্তরপ্রদেশের গ্রেটার নয়ডায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের শিকার হয়েছে একটি স্লিপার বাস। যমুনা এক্সপ্রেসওয়েতে চলন্ত অবস্থায় বাসটিতে আগুন লাগার পর অন্তত ৯ যাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে একজন নারী ও আটজন পুরুষ রয়েছেন। এ ঘটনায় আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন। প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জন যাত্রী নিয়ে বাসটি চলাচল করছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।
স্থানীয় সময় বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ১১টার দিকে যমুনা এক্সপ্রেসওয়ের জেওয়ার এলাকার কাছে এ দুর্ঘটনা ঘটে। অধিকাংশ যাত্রী তখন ঘুমিয়ে ছিলেন। আগুন দ্রুত পুরো বাসে ছড়িয়ে পড়ায় মুহূর্তের মধ্যেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ধোঁয়ায় বাসের ভেতর অন্ধকার হয়ে গেলে যাত্রীরা প্রাণ বাঁচাতে মরিয়া হয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। কয়েকজন জানালা দিয়ে লাফিয়ে এবং অন্যরা বিভিন্নভাবে বাস থেকে বের হতে সক্ষম হন।
বাসটি দিল্লির কাশ্মীরি গেট এলাকা থেকে উত্তরপ্রদেশের মহোবার উদ্দেশে যাচ্ছিল। পুলিশ জানিয়েছে, বাসটি যমুনা এক্সপ্রেসওয়ের প্রায় ৩৩ কিলোমিটার এলাকায় পৌঁছানোর পর আগুনের সূত্রপাত হয়। পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য অনুযায়ী, বাসের এসিতে স্পার্ক বা বিস্ফোরণের পর ইঞ্জিনের লুব্রিকেটিং অয়েলে আগুন ধরে যেতে পারে। এরপর দ্রুত আগুন পুরো বাসে ছড়িয়ে পড়ে। তবে অগ্নিকাণ্ডের কারণ নিয়ে তদন্ত চলছে।
এদিকে এ ঘটনায় যাত্রীদের পক্ষ থেকে গুরুতর অভিযোগও উঠেছে। একটি এফআইআরে বলা হয়েছে, আগুন লাগার আগে বাসের ভেতরে পোড়া গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল এবং কয়েকজন যাত্রী চালক ও কন্ডাক্টরকে বাস থামানোর জন্য সতর্ক করেছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তারা সেই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেন এবং বাস থামাননি। পরবর্তী সময়ে চালক ও কন্ডাক্টরকে পুলিশ আটক করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলছে।
আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর বাসের ভেতরে চরম আতঙ্ক তৈরি হয়। প্রত্যক্ষদর্শী ও বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা জানান, ঘন ধোঁয়ার কারণে ভেতরে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। অনেকেই শ্বাস নিতে পারছিলেন না। যাত্রীরা একে অপরকে ধাক্কা দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কেউ কেউ জানালা দিয়ে লাফিয়ে বাস থেকে বের হন। উদ্ধারকারীরাও জানালা ভেঙে ভেতরে থাকা যাত্রীদের বের করার চেষ্টা করেন।
দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া এক নারী যাত্রী জানান, তিনি তখন ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎ দরজায় ধাক্কার শব্দে তার ঘুম ভেঙে যায়। এরপর তিনি দেখতে পান বাসের ভেতরে ব্যাপক ভিড় ও ধোঁয়া। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে কোনো জিনিসপত্র নেওয়ার সুযোগ পাননি। এমনকি জুতা পরার সময়ও ছিল না। শুধু মোবাইল ফোনটি সঙ্গে নিয়ে বাস থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।
ওই যাত্রী আরও জানান, বাসের ভেতরে তখন সবাই প্রাণ বাঁচানোর জন্য ছোটাছুটি করছিলেন। অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে একে অপরকে ধাক্কা দিচ্ছিলেন অনেকে। একপর্যায়ে একজন তাকে টেনে বাইরে বের করে আনেন। বাসের ভেতরে এত বেশি ধোঁয়া ছিল যে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না এবং অনেক যাত্রী শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। তার আশপাশে থাকা বেশ কয়েকজন যাত্রী শেষ পর্যন্ত বের হতে পারেননি বলে আশঙ্কা করেন তিনি।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ও জেওয়ার থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। পুলিশ জানিয়েছে, প্রায় ২০ জন যাত্রীকে নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। আহতদের স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে নিহতদের পরিচয় শনাক্ত এবং দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত চলছে।
ঘটনার খবর পেয়ে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ শোক প্রকাশ করেন এবং নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। তিনি আহতদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন। নিহতদের পরিবারকে ২ লাখ রুপি এবং আহতদের ৫০ হাজার রুপি করে আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
ভয়াবহ এই দুর্ঘটনা ভারতের মহাসড়কে চলাচলকারী স্লিপার বাসগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। তদন্ত শেষ হলে আগুনের সুনির্দিষ্ট কারণ এবং দুর্ঘটনার আগে বাসটির নিরাপত্তাব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না, সে বিষয়ে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে।