জাতীয়

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলে সংবিধানে আসবে যেসব পরিবর্তন


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০৩:৩০ পিএম

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলে সংবিধানে আসবে যেসব পরিবর্তন
ছবি: সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই জুলাই সনদ বাস্তবায়নে লক্ষ্যে গণভোট নেওয়া হবে। ওই দিন আলাদা ব্যালটে ভোটাররা গণভোটে ভোট দেবেন।

সেখানে সুনির্দিষ্টভাবে মাত্র চারটি বিষয় লেখা থাকবে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ভোটারদের সমর্থন আছে কি না- এই প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দেবেন ভোটাররা। গত কয়েক দিন ধরে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে সারা দেশে গণভোট নিয়ে প্রচারণা শুরু হয়েছে। প্রথমে সরকার নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে শুধুমাত্র গণভোট নিয়ে প্রচারণা চালালেও পরে সেখান থেকে সরে এসে সরাসরি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা শুরু করে।

কয়েক দিন আগে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এ বিষয়ে রেডিও ও টেলিভিশনে প্রচারের জন্য একটি ভিডিও বার্তাও দেন। সেখানে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে বৈষম্য, শোষণ ও নিপীড়ন থেকে মুক্ত হবে দেশ এবং নতুন বাংলাদেশ গড়ার দরজা খুলে যাবে।”

সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন ও দফায় দফায় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠকের পর গণভোটে মোট ৮৪ সংস্কার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।এর মধ্যে ৪৭ প্রস্তাব সাংবিধানিক এবং ৩৭টি সাধারণ আইন বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছে সরকার।

গণভোটে ৮৪ সংস্কার প্রস্তাব থাকলেও এর মধ্যে কোনো কোনো প্রস্তাবে বিএনপি, কোনটিতে জামায়াতসহ অন্য রাজনৈতিক দলের ভিন্নমত (নোট অব ডিসেন্ট) রয়েছে। প্রথমে প্রস্তাব ছিল- যেসব বিষয়ে কোনো রাজনৈতিক দলের নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে, সে দল ক্ষমতায় গেলে ওই প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে না।

তবে শেষ পর্যন্ত এ বিষয়ে সমাধানে ব্যর্থ হয়ে সরকার গণভোটের সিদ্ধান্ত নেয়। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে আগামী সংসদ এই ৮৪ ধারা বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে। আর ‘না’ জয়ী হলে জুলাই সনদ কার্যকর হবে না।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে আগামী সংসদের সংবিধান সংস্কার পরিষদ ২৭০ দিন বা নয় মাসের মধ্যে জুলাই সনদ অনুযায়ী সাংবিধানিক সংস্কার করতে বাধ্য থাকবে। তা না হলে অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া সংবিধান সংশোধনের বিল পাস হয়েছে বলে গণ্য করা হবে।

গণভোটের চার প্রশ্ন: আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নিচের চার প্রশ্ন রেখে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ গণভোটের ব্যবস্থা রেখেছে।


> নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।

> আগামী সংসদ হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।

> সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর যে ৩০ প্রস্তাবে ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে।

> জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা হবে।

গণভোটের ব্যালটে ওই চার বিষয় যুক্ত থাকবে। তবে অনেক ভোটারের পক্ষেই বোঝা সম্ভব নয়- গণভোটে ‘হ্যাঁ’ দিলে কী কী পরিবর্তন আসবে, আর ‘না’ দিলে কোন কোন পরিবর্তন আসবে না।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ জয়ী হলে কোন কোন বিষয়ে পরিবর্তন আসবে কিংবা আসবে না, সেসব ব্যাখ্যা করা হলো:

১/ভাষা, জাতি ও মৌলিক সংস্কার

বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধানে বাংলা ছাড়া অন্য ভাষার স্বীকৃতি নেই। তবে জুলাই সনদে বলা হয়েছে- প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা, পাশাপাশি অন্য সব মাতৃভাষাকেও স্বীকৃতি দেওয়া হবে।

বাংলাদেশের নাগরিকেরা এতদিন বাঙালি জাতি হিসেবে পরিচিত হলেও সংস্কারের পর পরিচয় হবে বাংলাদেশি।

বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী সংবিধান সংশোধনের জন্য সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাগে, গণভোটের প্রয়োজন নেই। তবে জুলাই সনদে বলা হয়েছে- সংবিধান সংশোধনে সংসদের নিম্নকক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ এবং উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন হবে। অন্যদিকে সংবিধানের প্রস্তাবনা, ৮, ৪৮, ৫৬ ও ১৪২ অনুচ্ছেদ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পরিবর্তনে গণভোট লাগবে।

বর্তমান সংবিধানের ৭-এর ক ও খ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংবিধান রহিত করলে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান ছিল। জুলাই সনদে সেটি বিলুপ্ত করা হয়েছে।

বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ বর্তমান সংবিধানের মূলনীতি। তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হলে সংবিধানের মূলনীতি হবে- সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি।

বর্তমান সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। জুলাই সনদে যুক্ত হবে- সব সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ও যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করার বিষয়টি।

সংবিধানে বর্তমানে ২২ মৌলিক অধিকার রয়েছে। জুলাই সনদে এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট এবং ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার অধিকার।

২/রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী: ক্ষমতা ও ভারসাম্য

বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী জরুরি অবস্থা জারি হয় প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরে, যার ফলে মৌলিক অধিকার স্থগিত হয়। জুলাই সনদে বলা হয়েছে- জরুরি অবস্থা জারি করতে হলে মন্ত্রিসভার অনুমোদন লাগবে এবং ওই সভায় বিরোধী দলীয় নেতা বা উপনেতার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক হবে। জরুরি অবস্থার সময় সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মৌলিক অধিকার খর্ব করা যাবে না।

বর্তমানে রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য ভোটে নির্বাচিত হন। জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হলে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের সদস্যদের গোপন ব্যালটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন।

বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেন। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পর প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই রাষ্ট্রপতি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন ও এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগ দিতে পারবেন। এই প্রস্তাবে বিএনপি ভিন্নমত জানিয়েছে।

রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসনের ক্ষেত্রে বর্তমানে সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ ভোট প্রয়োজন হয়। জুলাই সনদে উভয় কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের বিধান যুক্ত করা হয়েছে।

আগে সরকারের অনুমোদনে রাষ্ট্রপতি যেকোনো অপরাধীকে ক্ষমা করতে পারতেন। জুলাই সনদে বলা হয়েছে—ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা পরিবারের সম্মতি ছাড়া ক্ষমা করা যাবে না।

২০০৮ সালে নির্বাচিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চারবার শপথ নিয়েছিলেন ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা। বিদ্যমান সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের কোনো সীমা নেই। জুলাই সনদে বলা হয়েছে—এক ব্যক্তি এক জীবনে সর্বোচ্চ ১০ বছর বা দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না।

বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী একাধিক পদে থাকতে পারেন। জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হলে প্রধানমন্ত্রী একাধিক পদে থাকতে পারবেন না। এ বিষয়ে বিএনপিসহ পাঁচটি দল নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে।

৩/সংসদ, নির্বাচন ও সরকার ব্যবস্থা

বর্তমান সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নেই। জুলাই সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। সরকার ও বিরোধী দলের মতামতের ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের কথা বলা হয়েছে।

স্বাধীনতার পর থেকে সংসদ এককক্ষবিশিষ্ট হলেও জুলাই সনদে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের প্রস্তাব করা হয়েছে। উচ্চকক্ষে সদস্য সংখ্যা হবে ১০০, যা রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে বণ্টন করা হবে।

সংসদে নারীদের সংরক্ষিত আসন ৫০ থেকে বাড়িয়ে ধাপে ধাপে ১০০ করার প্রস্তাব রয়েছে।

বর্তমানে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার সরকারি দল থেকে নির্বাচিত হন। জুলাই সনদ কার্যকর হলে ডেপুটি স্পিকার হবেন বিরোধী দল থেকে।

বর্তমান সংবিধানে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিলে এমপির পদ বাতিল হয়। জুলাই সনদে বাজেট ও আস্থাভোট ছাড়া অন্য বিষয়ে স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি করতে হলে সংসদের উভয় কক্ষের অনুমোদন বাধ্যতামূলক হবে।

সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বিশেষজ্ঞ কমিটি যুক্ত হবে।

নির্বাচন কমিশন গঠনে স্পিকারের সভাপতিত্বে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা, ডেপুটি স্পিকার ও আপিল বিভাগের বিচারপতিদের সমন্বয়ে কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে।

৪/আইন ও বিচার ব্যবস্থায় পরিবর্তন

সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ আপিল বিভাগ থেকে করার বিধান যুক্ত হবে।

বিচারক নিয়োগে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন কমিশন গঠিত হবে। বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা, বিভাগীয় বেঞ্চ স্থাপন, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল শক্তিশালীকরণসহ একাধিক সংস্কার যুক্ত করা হয়েছে।

ন্যায়পাল, দুদক, পিএসসি, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক নিয়োগে বিরোধী দলের অংশগ্রহণে পৃথক কমিটি গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। এসব বিষয়ে বিএনপিসহ কয়েকটি দল আপত্তি জানিয়েছে।

৫/আইন সংশোধনে ৩৭ সংস্কার

৪৭টি সাংবিধানিক সংস্কারের বাইরে ৩৭টি সংস্কার আইন, অধ্যাদেশ, বিধি ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে।

এ ছাড়া জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন, পৃথক পিএসসি, বিচার বিভাগ সংস্কার, প্রশাসনিক বিভাগ হিসেবে কুমিল্লা ও ফরিদপুর বিভাগ গঠনের প্রস্তাব রয়েছে।

১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটের ব্যালটে এসবের বিস্তারিত উল্লেখ থাকবে না। সেখানে কেবল চারটি সংক্ষিপ্ত পয়েন্টে ভোটারদের কাছ থেকে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট নেওয়া হবে।