রাজনীতি

বিএনপি আমলেও পদোন্নতি-পদায়নে বঞ্চিত বিএনপিপন্থী আমলারা


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৪৬ পিএম

বিএনপি আমলেও পদোন্নতি-পদায়নে বঞ্চিত বিএনপিপন্থী আমলারা
ছবি: সংগৃহীত

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও প্রশাসনে দলীয় পরিচয়ের কারণে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অনেকেই এখনো কাঙ্ক্ষিত পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাচ্ছেন না। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচিত হয়ে যারা দীর্ঘদিন পদোন্নতি, পদায়ন ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে বঞ্চিত ছিলেন, তাদের একটি বড় অংশের অবস্থার পরিবর্তন হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা এবং দলটির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকশ কর্মকর্তা এখনো প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্তত সাতজন সচিবও রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান সরকারের প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সমঝোতা করে তাদের কেউ কেউ পদোন্নতিসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছেন।

বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিএনপিপন্থী পরিচয়ের কারণে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দেওয়া, ওএসডি করা এবং পদোন্নতি আটকে রাখার মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। এখন সেই পুরোনো মামলা ও অভিযোগকে সামনে এনে তাদের আবারও পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে কিংবা অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখা হচ্ছে।

বিভিন্ন পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, ছাত্রজীবনে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণে তারা গত ১৫ বছর গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন থেকে দূরে ছিলেন। অনেককে বছরের পর বছর বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে রাখা হয়েছিল। সরকার পরিবর্তনের পরও তাদের ভাগ্যের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি বলে দাবি তাদের।

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী অবশ্য দলীয় পরিচয়ে পদোন্নতি বা পদায়নের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, সরকারি চাকরিতে দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে পদোন্নতি দেওয়ার সুযোগ নেই। স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও মেধার ভিত্তিতেই পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনকে দলীয়করণের কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই বলেও জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, কোনো কর্মকর্তা যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও বঞ্চিত হয়ে থাকলে সুনির্দিষ্টভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করা হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রশাসনে সক্রিয়ভাবে কাজ করা কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগের কথাও জানিয়েছেন তিনি।

প্রশাসনে বঞ্চনার অভিযোগের উদাহরণ হিসেবে কয়েকজন কর্মকর্তার বিষয় সামনে এসেছে। প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মো. বাবুল মিয়া আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দীর্ঘ সময় ওএসডি ছিলেন বলে জানা গেছে। বিসিএসের ১৫তম ব্যাচের এই কর্মকর্তা বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশনের অতিরিক্ত সচিব। একই ব্যাচের কয়েকজন কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ পদ পেলেও তিনি এখনো সচিব হতে পারেননি।

তার ব্যাচমেট আবুল হাছানাত হুমায়ুন কবীরও ছাত্রজীবনে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করলেও বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর অল্প সময়ের মধ্যে একাধিকবার বদলি হয়েছেন তিনি। বর্তমানে তিনি ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন।

এ ছাড়া বিসিএসের ১৮তম ব্যাচের একাধিক কর্মকর্তা সচিব হলেও একই ব্যাচের একজন অতিরিক্ত সচিব এখনো গুরুত্বপূর্ণ পদে যেতে পারেননি। ছাত্রজীবনে তিনি বুয়েটের একটি হলে ছাত্রদলের দায়িত্বে ছিলেন বলে জানা গেছে। একইভাবে বিসিএসের ২০তম ব্যাচের একজন যুগ্ম সচিব দীর্ঘদিন ধরে ওএসডি রয়েছেন। তিনিও ছাত্রজীবনে ছাত্রদলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

পুলিশ প্রশাসনেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। পুলিশ পরিদর্শক মনিরুল হক, যিনি ছাত্রজীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হল শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, বর্তমানে পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত রয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ঢাকায় গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন না পেলেও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তিনি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন।

এদিকে সম্প্রতি বিসিএসের ২৫তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের যুগ্ম সচিব হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হলেও একই ব্যাচের কয়েকজন কর্মকর্তা সেই তালিকায় জায়গা পাননি। তাদের মধ্যে বর্তমান সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব এবং বুয়েটের শেরেবাংলা হল শাখা ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদকও রয়েছেন। একই ব্যাচের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি একজন কর্মকর্তাও পদোন্নতি পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করা কয়েকজন কর্মকর্তার পদোন্নতি ও পদায়ন অব্যাহত রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকা কর্মকর্তা, সাবেক মন্ত্রীদের একান্ত সচিব এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারাও রয়েছেন।

কয়েকজন কর্মকর্তা বিদেশে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা অবস্থাতেও পদোন্নতি পেয়েছেন বলে জানা গেছে। আবার কেউ কেউ আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মন্ত্রী বা সচিবের একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পর বর্তমান সরকারের সময়ও গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন।

প্রশাসনের পাশাপাশি শিক্ষা খাতের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পে দায়িত্ব পালন করা কয়েকজন কর্মকর্তার মধ্যে কেউ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের কেউ কেউ আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নিয়োগ বা প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেলেও বর্তমান সময়েও বহাল রয়েছেন।

ফলে সরকারের রাজনৈতিক পালাবদলের পর প্রশাসনে দলীয় প্রভাব কতটা কমেছে এবং পদোন্নতি ও পদায়নে মেধা ও যোগ্যতা কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বঞ্চিত কর্মকর্তারা দ্রুত নিরপেক্ষ মূল্যায়নের মাধ্যমে তাদের প্রাপ্য পদোন্নতি ও দায়িত্ব নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।