সারাদেশ
বন্যা ও পাহাড়ধসে কক্সবাজারে ২৬ প্রাণহানি, দুর্বিষহ লাখো মানুষের জীবন
টানা ভারী বর্ষণে সৃষ্ট বন্যা ও পাহাড়ধসে কক্সবাজারে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। গত সাত দিন ধরে জেলার প্রায় তিন লাখ মানুষ দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন। গত ৫ জুলাই থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত পানিতে ডুবে ও পাহাড়ধসে জেলায় ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
সর্বশেষ শুক্রবার দুপুরে চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নে বসতবাড়ি প্লাবিত হওয়ায় নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে রসুলাবাদ এলাকার আবদুল মালেকের মেয়ে হাসনাতুল জান্নাত ঝর্ণা (১২) মারা যায়। এ ঘটনায় তার দুই বোনকে জীবিত উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার বিকেলে চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নের মাইজ কাকারা এলাকায় পানিতে ডুবে মোহাম্মদ ওয়াকিম (২) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। একই দিন সকালে বন্যার পানিতে ভেসে গিয়ে নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের পুষ্প (৩) প্রাণ হারায়। এছাড়া ভোরে চকরিয়ার মছনিয়া কাটা এলাকায় পাহাড়ধসে একটি বসতঘরের ওপর মাটি চাপা পড়ে একই পরিবারের দুই শিশুর মৃত্যু হয়। কক্সবাজার সদর, পেকুয়া ও উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প মিলিয়ে মৃতদের মধ্যে ১৫ জন রোহিঙ্গাসহ মোট ২৬ জন রয়েছেন।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় জেলার ১০টি উপজেলার ৩৫টি ইউনিয়নের অন্তত ১৫০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলা। এছাড়া সদর, রামু, উখিয়া, টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও ঈদগাঁও উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাও পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নূরুল ইসলাম জানান, বান্দরবান থেকে নেমে আসা ঢলে মাতামুহুরী নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় চকরিয়া ও পেকুয়ার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার বলেন, চকরিয়া ও মাতামুহুরীতে এক লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। ৯৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া দুর্গতদের শুকনো খাবারসহ জরুরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত ও পানি দ্রুত নামাতে স্লুইস গেট সচল রাখতে প্রশাসন কাজ করছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আজাদ রহমান জানান, সরকারি হিসাবে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ১ লাখ ৫০ হাজার ৬৬২ জন বন্যাকবলিত হয়েছেন। এর মধ্যে ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১৪ হাজার ৬১ জন আশ্রয় নিয়েছেন।
দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারিভাবে ২০০ টন চাল, ৪৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ত্রাণ বিতরণ ও জরুরি সহায়তা কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কন্ট্রোল রুমও চালু করা হয়েছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ মোহাম্মদ আবদুল হান্নান জানান, গত ছয় দিনে জেলায় ৭০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী দুই দিন মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে, ফলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি এবং নতুন করে পাহাড়ধসের আশঙ্কা রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে সমুদ্রবন্দর ও উপকূলীয় এলাকার জন্য স্থানীয় সতর্ক সংকেত নম্বর–৩ বহাল রাখা হয়েছে।