সোশ্যাল মিডিয়া
ফেসবুকে রাজনৈতিক অপতথ্য, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তে থাকা এক নতুন হুমকি: গবেষণায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)-এর গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীদের গবেষণায় উঠে এসেছে ফেসবুকে ‘রাজনৈতিক অপতথ্য’-এর ক্রমবর্ধমান বাস্তবতা।
রাস্তার পাশে চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছে একদল বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী। আশেপাশের সবকিছুই স্বাভাবিক নিয়মে চলছে। হঠাৎ একজন শিক্ষার্থী ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে দেখতে পায় একজন রাজনৈতিক নেতার নামে একটা সন্দেহজনক তথ্য। ভুঁইফোড় কোনো ফেসবুক পেজ থেকে সে তথ্যটা দেখতে পায়। কোনো সূত্র বা তথ্যের উৎস নাই। সে সরল বিশ্বাসে তা সবাইকে বলে পাশাপাশি নিজের প্রোফাইলে শেয়ার করে। কিছুদিন পর সে জানতে পারে এটা মিথ্যা তথ্য ছিল। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার ছিল তা হয়ে গেছে।
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীদের সাম্প্রতিক একটি গবেষণা এই চিত্রই ধারণ করছে সংখ্যা আর অভিজ্ঞতার ভাষায়।
এই বিভাগের পাঁচ শিক্ষার্থী মোঃ কামরুজ্জামান, মোরসালিন সৈকত, আবিদা সাদিকা নুহা, জান্নাতুন নুর মোহনিয়াজ এবং আনিসুর রহমান আকাশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের নিয়ে Case Study এবং Focus Group Discussion এর মাধ্যমে “The Role of Facebook Pages in Spreading Political Disinformation on Facebook and the Effects on University Students” শিরোনামে গবেষণা পরিচালনা করেছেন। সেখানে উঠে এসেছে এক অস্বস্তিকর বাস্তবতাঃ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের তথ্য গ্রহণের পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন আনলেও এর সঙ্গে বেড়েছে ভুয়া তথ্য ও অপতথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা।
ফেসবুকঃ রাজনৈতিক অপতথ্য ছড়ানোর মাধ্যম
বাংলাদেশে ফেসবুক সবচেয়ে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হওয়ায় এটি জনমত গঠনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, রাজনৈতিক অপতথ্য সাধারণত বেনামি বা ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট, রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট পেজ এবং সমন্বিত অনলাইন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এছাড়াও গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান হলো ফেসবুকের অ্যালগরিদমের ভূমিকা।
অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, তারা রাজনৈতিক খবর খুঁজে না দেখলেও নিয়মিতভাবে অপরিচিত পেজের রাজনৈতিক কনটেন্ট দেখতে পান। ফেসবুকের সাজেস্টেড পোস্ট, ট্রেন্ডিং কনটেন্ট এবং অ্যালগরিদমভিত্তিক সুপারিশ ব্যবহারকারীদের বারবার একই ধরনের রাজনৈতিক বয়ানের মুখোমুখি করে, ফলে বিভ্রান্তিকর তথ্য আরও বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
বোঝার উপায় নেই যে এগুলো অপতথ্য
কেস স্টাডি ও ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশন এর মাধ্যমে উঠে এসেছে গবেষণায় অংশগ্রহণকারী অধিকাংশ শিক্ষার্থী মনে করেন, ফেসবুকে প্রচারিত রাজনৈতিক অপতথ্য শনাক্ত করা অনেক ক্ষেত্রেই কঠিন। কারণ এসব তথ্য সাধারণত পরিচিত সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের মতো উপস্থাপন করা হয় এবং এর সঙ্গে যুক্ত করা হয় সম্পাদিত ছবি, ভিডিও, আকর্ষণীয় শিরোনাম ও আবেগনির্ভর ভাষা। একই ধরনের তথ্য একাধিক পেজ ও অ্যাকাউন্ট থেকে বারবার প্রচারিত হওয়ায় ব্যবহারকারীদের কাছে সেগুলো বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয়।
ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশনে অংশগ্রহণকারীরা জানান, ফেসবুকের অ্যালগরিদমের কারণে তারা প্রায়ই অপরিচিত পেজের রাজনৈতিক কনটেন্ট দেখতে পান, যা সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের সুযোগ পাওয়ার আগেই ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে অনেক ব্যবহারকারী বুঝতেই পারেন না যে তারা প্রকৃত তথ্য নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে তৈরি ও প্রচারিত অপতথ্যের মুখোমুখি হচ্ছেন।
তরুণদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে ভয় ও বিভ্রান্তিঃ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরাও সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়
গবেষণায় দেখা গেছে, রাজনৈতিক অপতথ্যের প্রভাব থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরাও পুরোপুরি মুক্ত নন। ফোকাস গ্রুপ আলোচনায় অংশগ্রহণকারী অনেক শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, ফেসবুকে বারবার বিভ্রান্তিকর রাজনৈতিক কনটেন্ট দেখার ফলে তাদের মধ্যে ভয়, উদ্বেগ, বিভ্রান্তি এবং মানসিক অস্বস্তি তৈরি হয়।
বিশেষ করে রাজনৈতিক সংঘাত, সহিংসতা বা বিতর্কিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছড়ানো অতিরঞ্জিত ও আবেগনির্ভর পোস্টগুলো অনেক সময় বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে ভুল ধারণা সৃষ্টি করে। যদিও অধিকাংশ শিক্ষার্থী তথ্য যাচাইয়ের চেষ্টা করেন এবং দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করেন না, তবুও গবেষণায় দেখা গেছে যে বারবার অপতথ্যের সংস্পর্শে আসা তাদের মানসিক অবস্থাকে প্রভাবিত করে এবং সাময়িকভাবে রাজনৈতিক ঘটনা ও ব্যক্তিদের সম্পর্কে নেতিবাচক বা বিভ্রান্তিকর ধারণা তৈরি করতে পারে।
অপতথ্য মোকাবেলার গবেষকদের মতামত
শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিডিয়া লিটারেসি বৃদ্ধি করতে হবে। তথ্য যাচাইয়ের দক্ষতা বাড়াতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম প্রয়োজন। ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোকে বিভ্রান্তিকর তথ্য শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। রাজনৈতিক বিভ্রান্তি মোকাবিলায় সরকার, গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
গবেষণাটি বলছে, বাংলাদেশে ফেসবুকভিত্তিক রাজনৈতিক বিভ্রান্তি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও গণতান্ত্রিক চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বিভ্রান্তিকর তথ্যের কৌশলও পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই তথ্য যাচাই, মিডিয়া শিক্ষার প্রসার এবং দায়িত্বশীল ডিজিটাল ব্যবহারের মাধ্যমে এ সমস্যার মোকাবিলা করা জরুরি।