সোশ্যাল মিডিয়া
যুদ্ধের জন্য নয়, সার্বভৌমত্বের জন্য আধুনিক ফাইটার জেট
পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশের প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ছে। নতুন যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, সাবমেরিন, বিমানবাহী রণতরী কিংবা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এসবের উন্নয়নে প্রতি বছর ব্যয় হচ্ছে শত শত বিলিয়ন ডলার। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায় এই দেশগুলো কি সবাই যুদ্ধ করতে চায় ? উত্তরটি স্পষ্ট না।
আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সামরিক শক্তির উদ্দেশ্য কেবল যুদ্ধ জয় করা নয় বরং যুদ্ধ প্রতিরোধ করা, জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি রাষ্ট্রের অবস্থানকে শক্তিশালী করা। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় একে বলা হয় Deterrence বা প্রতিরোধমূলক সক্ষমতা। অর্থাৎ, এমন একটি শক্তি অর্জন করা যাতে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ আগ্রাসনের আগে বহুবার চিন্তা করতে বাধ্য হয়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আধুনিক ফাইটার জেটের প্রশ্নটি ঠিক এই প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা উচিত। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে প্রতিরক্ষা নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই দুটি চরম অবস্থান সামনে আসে। একপক্ষ মনে করে, যুদ্ধবিমান কেনা মানেই যুদ্ধের প্রস্তুতি। অন্যপক্ষ আবার মনে করে, যত বেশি অস্ত্র, তত বেশি নিরাপত্তা। বাস্তবে এই দুই ধারণার কোনোটিই পুরোপুরি সঠিক নয়।
একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র কখনো যুদ্ধ চায় না। আবার নিজের নিরাপত্তাকে ভাগ্যের ওপরও ছেড়ে দেয় না।
বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর থেকেই শান্তিপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতিতে বিশ্বাস করে এসেছে। "সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়" এই নীতি শুধু একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয় এটি আমাদের কূটনৈতিক পরিচয়ের অংশ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই নীতিকে কার্যকর রাখতে কী শুধু সদিচ্ছাই যথেষ্ট? ইতিহাস বলছে না।
শান্তির জন্যও শক্তি দরকার
মানবসভ্যতার ইতিহাসে দুর্বল রাষ্ট্রগুলো সবসময়ই ঝুঁকির মুখে ছিল। কখনো তারা সরাসরি আগ্রাসনের শিকার হয়েছে, কখনো কূটনৈতিক চাপের, আবার কখনো অর্থনৈতিক বা কৌশলগত প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে।
প্রাচীন চীনা সামরিক দার্শনিক সান জু তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The Art of War এ লিখেছিলেন, "যুদ্ধ না করেই শত্রুকে নিবৃত্ত করতে পারাই সর্বোচ্চ কৌশল।" আধুনিক নিরাপত্তা নীতির সঙ্গে এই ধারণার গভীর মিল রয়েছে।
একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনেক সময় যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই সেটিকে থামিয়ে দেয়। বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামরিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর দিকে তাকালেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়।
চীনের সামরিক শক্তি যুদ্ধের জন্য, নাকি বার্তার জন্য ?
আজ বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক রাষ্ট্র চীন। তাদের রয়েছে শত শত আধুনিক যুদ্ধবিমান, পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ ফাইটার, বিশাল নৌবহর, হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র, বিমানবাহী রণতরী এবং অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
কিন্তু প্রশ্ন হলো চীন কি প্রতিদিন যুদ্ধ করছে ? না। তাহলে এত বিশাল সামরিক শক্তির প্রয়োজন কেন? কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তি কেবল ব্যবহারের জন্য নয়, অনেক সময় শক্তি থাকাটাই সবচেয়ে বড় বার্তা। তাইওয়ান প্রণালী, দক্ষিণ চীন সাগর কিংবা পূর্ব এশিয়ার কৌশলগত অঞ্চলগুলোতে চীনের সামরিক উপস্থিতি শুধু সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য নয় বরং এটি একটি কূটনৈতিক সংকেতও চীনের সার্বভৌম স্বার্থকে উপেক্ষা করা সহজ হবে না।
একই বাস্তবতা দেখা যায় জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য এবং সিঙ্গাপুর এর ক্ষেত্রেও। এ দেশগুলো যুদ্ধপ্রিয় নয়। কিন্তু তারা জানে শান্তি টিকিয়ে রাখতে সক্ষমতা অপরিহার্য।
বাংলাদেশের মতো অনেকেই প্রশ্ন করেন "আমরা তো ছোট দেশ। আমাদের এত উন্নত যুদ্ধবিমান কেন দরকার?"
কিন্তু বাস্তবতা হলো রাষ্ট্রের আকার নয়; তার কৌশলগত অবস্থানই নিরাপত্তার চাহিদা নির্ধারণ করে।
সিঙ্গাপুরের আয়তন বাংলাদেশের একটি জেলার চেয়েও ছোট। তবুও তাদের বিমান বাহিনী এশিয়ার অন্যতম আধুনিক বাহিনী। কারণ দেশটি বুঝেছে, বন্দর, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তখনই নিরাপদ থাকবে, যখন আকাশসীমাও নিরাপদ থাকবে।
একইভাবে কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ফিনল্যান্ড নিজেদের ভৌগোলিক বাস্তবতা অনুযায়ী উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। কারণ তারা উপলব্ধি করেছে নিরাপত্তা ব্যয় কোনো বিলাসিতা নয়; এটি জাতীয় স্থিতিশীলতার বিনিয়োগ।
বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন নয়
বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র । বঙ্গোপসাগরে আমাদের বিশাল সামুদ্রিক অর্থনৈতিক অঞ্চল রয়েছে। সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতি বা Blue ইকোনমি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির অন্যতম সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র।
এ ছাড়া পদ্মা সেতু, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, পায়রা বন্দর, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ অসংখ্য কৌশলগত অবকাঠামো গড়ে উঠেছে।
এসব সম্পদ রক্ষা করা শুধু সেনাবাহিনীর নয়; বিমান বাহিনীরও অন্যতম দায়িত্ব। আধুনিক যুদ্ধবিমান কেবল আকাশযুদ্ধের জন্য নয়। এগুলো আকাশসীমা নজরদারি, অজ্ঞাত উড়োজাহাজ শনাক্তকরণ, দ্রুত প্রতিক্রিয়া, সামুদ্রিক টহল সমন্বয় এবং জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
যে রাষ্ট্র নিজের আকাশসীমা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না সে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বও দীর্ঘমেয়াদে প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
শক্তি মানেই যুদ্ধ নয় বাংলাদেশে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যুদ্ধবিমান কেনা মানেই যুদ্ধের প্রস্তুতি। বাস্তবতা ঠিক উল্টো। একটি বাড়িতে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র রাখা মানে এই নয় যে সেই বাড়িতে আগুন লাগবেই। বরং এটি প্রস্তুতির প্রতীক।
একটি রাষ্ট্রের আধুনিক বিমান বাহিনীও তেমনই। যখন সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ জানে যে বাংলাদেশের আকাশসীমা সুরক্ষিত, দ্রুত প্রতিক্রিয়ার সক্ষমতা রয়েছে এবং যেকোনো আগ্রাসনের মূল্য অনেক বেশি হতে পারে, তখন সেই আগ্রাসনের সম্ভাবনাই কমে যায়।
অর্থাৎ শক্তিশালী প্রতিরক্ষা অনেক সময় যুদ্ধের কারণ নয়; বরং যুদ্ধ ঠেকানোর অন্যতম কার্যকর উপায়।
বাংলাদেশের জন্য আধুনিক ফাইটার জেটের প্রশ্নটিও তাই কেবল সামরিক নয়; এটি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মবিশ্বাস, সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রশ্ন।
কূটনীতির ভাষা শুধু শব্দে নয়, সক্ষমতায়ও লেখা হয় আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি অপ্রিয় কিন্তু বাস্তব সত্য হলো বিশ্বরাজনীতি কেবল ন্যায়, আইন বা নীতির ওপর চলে না; সেখানে রাষ্ট্রের সক্ষমতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষা। একটি দেশের কূটনীতিক যতই দক্ষ হোন না কেন, তাঁর পেছনে যদি একটি বিশ্বাসযোগ্য রাষ্ট্রক্ষমতা না থাকে, তাহলে অনেক সময় সেই কূটনীতির কার্যকারিতা সীমিত হয়ে যায়।
এ কারণেই পৃথিবীর প্রায় সব উন্নত দেশ কূটনীতি ও প্রতিরক্ষাকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয় বরং পরিপূরক হিসেবে দেখে। শীতল যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে সরাসরি বড় যুদ্ধ হয়নি। এর অন্যতম কারণ ছিল উভয় পক্ষই জানত, সংঘাতের মূল্য হবে ভয়াবহ। শক্তির সেই ভারসাম্যই বহু ক্ষেত্রে যুদ্ধকে ঠেকিয়ে রেখেছিল।
আজও একই বাস্তবতা বিদ্যমান। আন্তর্জাতিক সম্পর্কে এটি Credible Deterrence বা "বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধক্ষমতা" নামে পরিচিত। অর্থাৎ একটি রাষ্ট্রের এমন সক্ষমতা থাকতে হবে যাতে অন্যরা নিশ্চিত থাকে এই রাষ্ট্র তার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারবে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রশ্নটি তাই যুদ্ধের নয়; বরং বিশ্বাসযোগ্য সক্ষমতার। প্রতিবেশী অঞ্চলের বাস্তবতা আমাদের কী শেখায় ? দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বের অন্যতম সংবেদনশীল ভূরাজনৈতিক অঞ্চল। এখানে সীমান্ত, পানি, নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা সবকিছুই রাষ্ট্রগুলোর নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলে।
সম্প্রতি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধু নদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে উত্তেজনা নতুন করে আলোচনায় আসে। ভারতের পক্ষ থেকে পানি ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো নিয়ে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দেওয়া হলে পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বও কঠোর ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানায়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বলা হয়, যদি এমন কোনো অবকাঠামো তাদের অস্তিত্বগত নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তবে সেটিকে সামরিকভাবে মোকাবিলার বিষয় হিসেবে দেখা হতে পারে।
এই ঘটনার মূল শিক্ষা যুদ্ধকে সমর্থন করা নয়। বরং এটি দেখায় যে রাষ্ট্রগুলো যখন নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থের প্রশ্নে কথা বলে, তখন তাদের বক্তব্যের পেছনে সামরিক সক্ষমতাও একটি প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। আন্তর্জাতিক আলোচনার টেবিলে অনেক সময় যুক্তির পাশাপাশি সক্ষমতাও গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। আকাশসীমা রক্ষা শুধু বিমান বাহিনীর দায়িত্ব নয়, রাষ্ট্রের দায়িত্ব বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে বঙ্গোপসাগর, অন্যদিকে ব্যস্ত আঞ্চলিক আকাশপথ। প্রতিদিন অসংখ্য বেসামরিক উড়োজাহাজ আমাদের আকাশসীমা ব্যবহার করে। একই সঙ্গে সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতি, গভীর সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, গ্যাস স্থাপনা, শিল্পাঞ্চল এবং যোগাযোগ অবকাঠামো দেশের অর্থনীতির ভিত্তি হয়ে উঠছে।
এই সম্পদগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি আধুনিক বিমান বাহিনী অপরিহার্য।
আধুনিক যুদ্ধবিমান শুধু শত্রু বিমান ভূপাতিত করার জন্য নয়। এগুলো অজ্ঞাত উড়োজাহাজ শনাক্ত করা, দ্রুত বাধা প্রদান (Quick Reaction Alert), সামুদ্রিক নজরদারি সমন্বয়, দুর্যোগকালে আকাশপথে সহায়তা এবং কৌশলগত প্রতিক্রিয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অর্থাৎ, একটি ফাইটার জেটের মূল্য কেবল তার অস্ত্রে নয়; তার উপস্থিতি, প্রস্তুতি এবং প্রতিক্রিয়া সক্ষমতায়। অর্থনীতি নাকি প্রতিরক্ষা এটি কি সত্যিই দ্বন্দ্ব? বাংলাদেশে প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নের আলোচনা উঠলেই একটি প্রশ্ন আসে "এই টাকা কি শিক্ষা বা স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করা উচিত নয়?" প্রশ্নটি যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু এর উত্তরও বাস্তবতার ভিত্তিতে দিতে হবে।
রাষ্ট্র পরিচালনায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, অবকাঠামো, প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষা সবগুলোই অপরিহার্য খাত। একটির প্রয়োজনীয়তা দেখিয়ে আরেকটিকে অপ্রয়োজনীয় বলা যায় না। যেমন একটি পরিবার সন্তানের শিক্ষার পাশাপাশি বাড়ির নিরাপত্তার দিকেও খেয়াল রাখে, তেমনি একটি রাষ্ট্রও উন্নয়নের পাশাপাশি নিরাপত্তায় বিনিয়োগ করে।
বিশ্বের উন্নত অর্থনীতিগুলো যেমন জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ফ্রান্স কিংবা সিঙ্গাপুর শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে যেমন বিনিয়োগ করেছে, তেমনি নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাও আধুনিক করেছে। কারণ তারা জানে, নিরাপত্তাহীন উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হয় না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য।
প্রযুক্তির যুগে পুরোনো সক্ষমতা যথেষ্ট নয়
বিশ্বে যুদ্ধের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আজকের যুদ্ধ শুধু বিমান বনাম বিমানের লড়াই নয়। এখন রয়েছে স্টেলথ প্রযুক্তি, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক লক্ষ্য শনাক্তকরণ, নেটওয়ার্ক কেন্দ্রিক যুদ্ধ, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার এবং দীর্ঘপাল্লার নির্ভুল অস্ত্র। এই বাস্তবতায় একটি আধুনিক বিমান বাহিনী শুধু নতুন যুদ্ধবিমান কেনার বিষয় নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ প্রযুক্তিগত পরিবেশ গড়ে তোলার বিষয়।
বাংলাদেশকে যদি আগামী ২০ থেকে ৩০ বছরের নিরাপত্তা চাহিদা বিবেচনা করতে হয়, তাহলে এখন থেকেই পরিকল্পিত আধুনিকায়ন শুরু করতে হবে। কারণ যুদ্ধবিমান কেনা একদিনের সিদ্ধান্ত হলেও, দক্ষ পাইলট তৈরি, প্রকৌশলী গড়ে তোলা, রক্ষণাবেক্ষণ অবকাঠামো নির্মাণ এবং সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে অনেক বছর সময় লাগে।
শক্তিশালী প্রতিরক্ষা মানেই আক্রমণাত্মক নীতি নয় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বারবার মনে রাখা দরকার। বাংলাদেশ কখনো সম্প্রসারণবাদী রাষ্ট্র ছিল না, নয় এবং হওয়ারও কোনো কারণ নেই। আমাদের সংবিধান, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং পররাষ্ট্রনীতি সবই শান্তি, সহযোগিতা ও পারস্পরিক সম্মানের কথা বলে।
কিন্তু শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যও প্রস্তুতি থাকতে হয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে, যেখানে সামরিকভাবে প্রস্তুত রাষ্ট্রগুলো সংঘাত এড়াতে সক্ষম হয়েছে; আবার প্রস্তুতিহীন রাষ্ট্রগুলো কূটনৈতিকভাবে দুর্বল অবস্থানে পড়েছে।
সুতরাং আধুনিক ফাইটার জেট কেনার প্রশ্নটি যুদ্ধের নয় বরং এমন একটি সক্ষমতা গড়ে তোলার প্রশ্ন, যা অন্যদের কাছে স্পষ্ট বার্তা দেবে বাংলাদেশ শান্তিপ্রিয়, কিন্তু নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রস্তুত।
বাংলাদেশের কী ধরনের বিমান বাহিনী দরকার?
আধুনিক ফাইটার জেটের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আরেকটি ভুল ধারণা দূর করা জরুরি। বিষয়টি কখনোই "যত বেশি যুদ্ধবিমান, তত বেশি শক্তিশালী" এমন সরল সমীকরণ নয়।
বাংলাদেশের প্রয়োজন একটি ভারসাম্যপূর্ণ, প্রযুক্তিনির্ভর এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর দাঁড়ানো বিমান বাহিনী। অর্থাৎ এমন একটি বাহিনী, যা দেশের আকাশসীমা সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখতে পারবে; প্রয়োজনে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবে; সমুদ্রসীমার নিরাপত্তায় নৌবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করবে; এবং আধুনিক যুদ্ধের প্রযুক্তিগত বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারবে।
এ জন্য শুধু নতুন যুদ্ধবিমান কিনলেই হবে না। প্রয়োজন আধুনিক ত্রিমাত্রিক রাডার নেটওয়ার্ক, উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, নিরাপদ যোগাযোগ প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সক্ষমতা, দক্ষ প্রকৌশলী, প্রশিক্ষিত পাইলট এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ অবকাঠামো। অর্থাৎ, একটি ফাইটার জেট কখনো একা যুদ্ধ করে না, তার পেছনে থাকে একটি সম্পূর্ণ প্রযুক্তিগত ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা।
ফোর্সেস গোল ২০৩০
পরিকল্পনা ছিল, এখন দরকার ধারাবাহিক বাস্তবায়ন বাংলাদেশ বহু বছর আগে ফোর্সেস গোল ২০৩০ গ্রহণ করেছিল যার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সশস্ত্র বাহিনীর ধাপে ধাপে আধুনিকায়ন। এই পরিকল্পনার লক্ষ্য কখনোই আক্রমণাত্মক সামরিক শক্তি গড়ে তোলা ছিল না। বরং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, আকাশ, স্থল ও সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সক্ষমতা তৈরি করা।
বিশ্বের প্রযুক্তি দ্রুত বদলাচ্ছে। ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার সক্ষমতা, স্টেলথ প্রযুক্তি এবং দীর্ঘপাল্লার নির্ভুল অস্ত্রের যুগে দাঁড়িয়ে প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকেও সময়ের সঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। আজ যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তার ফল ভোগ করবে আগামী দুই বা তিন দশকের বাংলাদেশ।
যুদ্ধবিমান শুধু যুদ্ধের অস্ত্র নয়, রাষ্ট্রের মর্যাদার প্রতীকও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সামরিক সক্ষমতার একটি মনস্তাত্ত্বিক দিকও রয়েছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অবদান বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। আমাদের সশস্ত্র বাহিনী পেশাদারিত্বের জন্য সম্মান অর্জন করেছে। কিন্তু সেই সম্মান ধরে রাখতে হলে প্রযুক্তিগত সক্ষমতার উন্নয়নও জরুরি।
একটি আধুনিক বিমান বাহিনী আন্তর্জাতিক মহড়ায় অংশগ্রহণ, যৌথ প্রশিক্ষণ, মানবিক সহায়তা, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং কৌশলগত সহযোগিতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অর্থাৎ এটি শুধু যুদ্ধের সক্ষমতা নয় এটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক সক্ষমতারও প্রতিফলন।
শান্তির সবচেয়ে বড় রক্ষক প্রস্তুতি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস আমাদের একটি শিক্ষা দেয় স্বাধীনতা অর্জন যেমন কঠিন, স্বাধীনতা রক্ষা তার চেয়েও কঠিন। একটি রাষ্ট্র কখনোই ধরে নিতে পারে না যে ভবিষ্যৎ সব সময় বর্তমানের মতোই শান্ত থাকবে।
বিশ্বের ইতিহাসে এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে, যেখানে কয়েক মাস আগেও যুদ্ধের সম্ভাবনা খুব কম বলে মনে করা হয়েছিল, কিন্তু হঠাৎ করেই পরিস্থিতি বদলে গেছে। সেই কারণেই দায়িত্বশীল রাষ্ট্রগুলো সম্ভাবনার জন্য নয়, সম্ভাব্য ঝুঁকির জন্য প্রস্তুতি নেয়। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম হতে পারে না। যদি আমরা চাই আগামী প্রজন্ম একটি নিরাপদ, আত্মবিশ্বাসী এবং মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ পাবে, তাহলে আজ থেকেই আমাদের নিরাপত্তা অবকাঠামোকে সময়োপযোগী করতে হবে।
ফাইটার জেট বিলাসিতা নয়, দায়িত্বশীল রাষ্ট্রচিন্তার অংশ
বাংলাদেশের আধুনিক ফাইটার জেট প্রয়োজন কি না এই প্রশ্নের উত্তর কেবল প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণের বিষয় নয় এটি রাষ্ট্রদর্শনেরও প্রশ্ন। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু সীমান্ত রক্ষা করা নয়; তার আকাশসীমা, সমুদ্রসীমা, কৌশলগত অবকাঠামো, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং জাতীয় মর্যাদাও সমানভাবে সুরক্ষিত রাখা।
ফাইটার জেট কেনা মানেই যুদ্ধের পথে হাঁটা নয়। বরং এটি এমন একটি সক্ষমতা গড়ে তোলা, যা সম্ভাব্য আগ্রাসনকে নিরুৎসাহিত করে, কূটনীতিকে শক্তিশালী করে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি রাষ্ট্রের অবস্থানকে আরও দৃঢ় করে।
বাংলাদেশের লক্ষ্য কখনোই অস্ত্রের প্রতিযোগিতায় নামা হওয়া উচিত নয়। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তোলা যাতে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েও আমরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি, এই রাষ্ট্র তার স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রস্তুত।
কারণ ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট শান্তি শুধু সদিচ্ছায় টিকে থাকে না; শান্তি টিকে থাকে প্রস্তুতি, সক্ষমতা এবং আত্মবিশ্বাসের ওপর। আধুনিক ফাইটার জেট তাই যুদ্ধের প্রতীক নয় এটি একটি আত্মমর্যাদাশীল, দায়িত্বশীল এবং ভবিষ্যতমুখী বাংলাদেশের প্রতীক।
লেখকঃ মুহতাসিম আলম মারুফ
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, প্রাইমএশিয়া ইউনিভার্সিটি