অর্থনীতি

এস আলম যুগের নিয়োগে বেকায়দায় ইসলামী ব্যাংক!


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৫, ০৩:৫৫ পিএম

এস আলম যুগের নিয়োগে বেকায়দায় ইসলামী ব্যাংক!
ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকার সময় নিয়োগ পাওয়া হাজারো কর্মকর্তা–কর্মচারী নিয়ে এখন বিপাকে পড়েছে দেশের অন্যতম বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ হারায় এস আলম গ্রুপ। তখন পালিয়ে যান গ্রুপ–সংশ্লিষ্ট শীর্ষ পর্যায়ের অনেক কর্মকর্তা। বর্তমানে ব্যাংকটির নতুন ব্যবস্থাপনা ওই সময়ের অনিয়মিত নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীদের নিয়ে নানা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।

শৃঙ্খলাভঙ্গ, নিয়মবহির্ভূত নিয়োগ ও অযোগ্যতার অভিযোগে ইতিমধ্যে প্রায় সাড়ে চার হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকটি নতুন করে জনবল নিয়োগের উদ্যোগও নিয়েছে।

২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেয় চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপ। ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, তখন ব্যাংকটির কর্মী সংখ্যা ছিল ১৩ হাজার ৫১৫ জন। আর ২০২৪ সালে নিয়ন্ত্রণ হারানোর সময় এই সংখ্যা দাঁড়ায় ২১ হাজার ৭০৬ জনে। অর্থাৎ, এই সাত বছরে প্রায় ১০ হাজার ৮৩৪ কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়, যার মধ্যে প্রায় ২ হাজার কর্মী নিয়মিত অবসরে যান।

তবে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো—এসব নিয়োগের প্রায় সবই হয়েছিল বিজ্ঞপ্তি ও পরীক্ষা ছাড়াই। এস আলমের সময়কালে নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের মধ্যে শুধু চট্টগ্রাম জেলারই ছিলেন ৭ হাজার ২২৪ জন। এর মধ্যে পটিয়া উপজেলা, যা এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলমের নিজ এলাকা, সেখানকার কর্মীই ছিলেন ৪ হাজার ৫২৪ জন।

ব্যাংক–সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ওই সময় ব্যাংকটি চার দফায় ৬৩৮ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়। এছাড়া ৩০০ ট্রেইনি সহকারী কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়, যার মধ্যে একটি পরীক্ষায় শুধু চট্টগ্রামের বাসিন্দারাই আবেদন করতে পেরেছিলেন।

এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকাকালীন সময়ে ইসলামী ব্যাংক থেকে নামে–বেনামে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়, যা এখন সম্পূর্ণ খেলাপিতে পরিণত। এর ফলে ব্যাংকটির প্রায় অর্ধেক ঋণই অকার্যকর, এবং প্রতিষ্ঠানটি পড়েছে বড় ধরনের মূলধন ঘাটতিতে।

২০২৫ সালের জুন শেষে ব্যাংকটির মূলধনের ঘাটতি বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা। ব্যাংকটির ইতিহাসে এটি অন্যতম বড় আর্থিক সংকট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়। নতুন পরিচালনা পর্ষদ একাধিক নিরীক্ষা সংস্থা দিয়ে ব্যাংকের ঋণ, বিনিয়োগ ও জনবল সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করায়।

তদন্তে উঠে আসে, এস আলমের আমলে নিয়োগ পাওয়া অনেক কর্মীর অযোগ্যতা, জাল সনদ, ও চাকরিবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা। এসবের ভিত্তিতে ব্যাংকটি প্রথম পর্যায়ে ২০০ কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করে।

পরে নিয়োগ যাচাইয়ের জন্য ৫ হাজার ৩৮৫ জন কর্মীর যোগ্যতা মূল্যায়ন পরীক্ষা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু ৪ হাজার ৯৫৩ জনই পরীক্ষায় অংশ নেননি। তাঁদের ব্যাংক থেকে ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করে রাখা হয়। ধারাবাহিক অনুপস্থিতি ও শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে পরবর্তীতে তাঁদের মধ্যে সাড়ে চার হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীকে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়।

চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের অবসর সুবিধা দিতে ব্যাংকের প্রায় ৪৫ কোটি টাকা ব্যয় হবে বলে জানা গেছে। এদিকে, পরীক্ষায় অংশ না নেওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে ৭০০ জন নতুন করে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের বিষয়ে ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে ব্যাংকটি।

অন্যদিকে, নিম্নপদে নিয়োগ পাওয়া প্রায় আট হাজার কর্মীর যোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার পরিকল্পনাও চলছে। পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে তাঁদের মধ্যে যোগ্যদের নিয়মিত করা হতে পারে।

ইসলামী ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) এম কামাল উদ্দীন জসীম বলেন, “২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে যেসব নিয়োগ হয়েছে, তার অধিকাংশই প্রক্রিয়াবহির্ভূত। অনেক ক্ষেত্রে বিজ্ঞপ্তি ছাড়া নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, আবার যেখানে বিজ্ঞপ্তি ছিল, সেখানেও পরীক্ষার স্বচ্ছতা ছিল না। আমরা চেয়েছিলাম পরীক্ষার মাধ্যমে তাঁদের যোগ্যতা যাচাই করে নিয়মিত করা হোক। কিন্তু বেশিরভাগ কর্মী পরীক্ষায় অংশ নেননি এবং ব্যাংকের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছেন। তাই বাধ্য হয়ে তাঁদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।”

তিনি আরও জানান, “যাঁরা পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার নতুন করে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, তাঁদের বিষয়ে ব্যাংক ইতিবাচকভাবে ভাবছে। তাঁদের জন্য পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।”