ফিচার
জিআই স্বীকৃতির পরও কি বদলেছে তাঁতিদের জীবন?
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ কিংবা সোনারগাঁওয়ের অনেক ঘরেই আজও সকাল শুরু হয় তাঁতের শব্দে। সুতা আর নকশার জটিল প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে তৈরি হয় বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী জামদানি। আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত এই শাড়ি শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। সেই স্বীকৃতির ধারাবাহিকতায় জামদানি আজ বিশ্বে পরিচিতি পেয়েছে ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই (জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন) পণ্যের মর্যাদা হিসেবে। তবে প্রশ্ন রয়ে যায়— এই স্বীকৃতি কি শুধু দেশের গর্ব বাড়িয়েছে, নাকি বদলেছে জামদানি তাঁতিদের জীবনও?
জামদানি শুধু একটি শাড়ি নয়; এটি বাংলাদেশের শত বছরের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও দক্ষতার জীবন্ত প্রতিচ্ছবির এক নাম। মূলত নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ, সোনারগাঁও ও সিদ্ধিরগঞ্জ অঞ্চলের তাঁতিরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে হাতে বুনে আসছেন এই শাড়ি। বিশেষ নকশা, সূক্ষ্ম সুতো এবং হাতে তৈরি কারুকাজের কারণে জামদানি বিশ্বজুড়ে আলাদা মর্যাদা পেয়েছে। এই স্বাতন্ত্র্য ও নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী উৎপাদন পদ্ধতির জন্যই বাংলাদেশে জামদানিকে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
তবে এই স্বীকৃতি রাতারাতি আসেনি। এর পেছনে রয়েছে হাজারো তাঁতির দীর্ঘদিনের শ্রম, দক্ষতা ও ঐতিহ্য রক্ষার নীরব সংগ্রাম। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাঁতিরা একই নকশা ও কারুকাজের ধারা ধরে রেখেছেন। আধুনিকতার যুগে এসেও আধুনিক যন্ত্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেও তাঁরা হারিয়ে যেতে দেননি এই শিল্পকে। সত্যিকার অর্থে জামদানির জিআই স্বীকৃতির পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান সেই কারিগরদের, যাদের নাম কখনোই আলোচনায় আসে না।

অর্থনৈতিক দিক থেকে জামদানি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্পদ। দেশীয় ফ্যাশন শিল্পে জামদানির চাহিদা যেমন বেড়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারেও “বাংলাদেশি জামদানি” একটি আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছে। জিআই স্বীকৃতি পণ্যের সত্যতা ও মর্যাদা রক্ষা করে, ফলে রপ্তানির সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পায়। শুধু বৈদেশিক আয় নয়, স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান তৈরিতেও ভূমিকা রাখে এ শিল্প। হাজারো তাঁতি পরিবার, সুতা ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং শাড়ি বিক্রেতার জীবিকা কোনো না কোনোভাবে জামদানির সঙ্গে জড়িত।
তবে বাস্তবতা অনেক সময় ভিন্ন গল্প বলে। একটি জামদানি শাড়ি তৈরি করতে সপ্তাহ থেকে মাস পর্যন্ত সময় লাগলেও অধিকাংশ তাঁতি সেই অনুযায়ী ন্যায্য পারিশ্রমিক পান না। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং কম মজুরির কারণে অনেক তাঁতি আর্থিক সংকটে জীবনযাপন করেন। ফলে নতুন প্রজন্মের অনেকেই এই পেশায় আগ্রহ হারাচ্ছে। তারা মনে করে, দীর্ঘ শ্রমের তুলনায় আয় খুবই সীমিত। তাই অনেকে শহরমুখী হচ্ছে বা অন্য পেশা বেছে নিচ্ছে।
এ অবস্থায় জামদানির ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা জরুরি। শুধু ঐতিহ্য সংরক্ষণ নয়, এই শিল্পকে সময়োপযোগী করাও প্রয়োজন। নতুন প্রজন্মকে আকৃষ্ট করতে জামদানিকে আধুনিক ফ্যাশন ডিজাইনের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। যেমন— জামদানি মোটিফ ব্যবহার করে ওয়েস্টার্ন পোশাক, ব্যাগ, স্কার্ফ, গয়না বা ঘরসজ্জার সামগ্রী তৈরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক বিপণন, আন্তর্জাতিক ফ্যাশন সহযোগিতা এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে জামদানিকে নতুনভাবে উপস্থাপন করলে বিশ্ববাজারে এর চাহিদা আরও বাড়তে পারে।
জামদানি কেবল একটি জিআই পণ্য নয়; এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং হাজারো শ্রমজীবী মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক ঐতিহ্য। তবে এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু স্বীকৃতি নয়, প্রয়োজন তাঁতিদের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন। কারণ, যে হাতগুলো জামদানির নকশায় বাংলাদেশের গল্প বুনে চলে, তাদের জীবনও সম্মান ও নিরাপত্তার রঙে রাঙানো জরুরি।
লেখক: মারুফা জাহান মুমু, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি