সারাবিশ্ব
ফ্লাইদুবাইয়ের মালিক কে, নিয়ন্ত্রণ কার হাতে?
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইভিত্তিক বিমান সংস্থা ফ্লাইদুবাই-মালিকানার দিক থেকে সরাসরি দুবাই সরকারের সঙ্গে যুক্ত একটি প্রতিষ্ঠান। তুলনামূলক কম খরচে বিমান ভ্রমণের সুযোগ তৈরি এবং দুবাইয়ের বিমান যোগাযোগ আরও বিস্তৃত করার লক্ষ্য নিয়ে ২০০৮ সালে যাত্রা শুরু করে এয়ারলাইনটি। প্রতিষ্ঠার পর দুই দশকেরও কম সময়ে মধ্যপ্রাচ্য ছাড়িয়ে ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন গন্তব্যে নিজেদের কার্যক্রম বিস্তৃত করেছে ফ্লাইদুবাই।
ফ্লাইদুবাইয়ের মালিক কে?
ফ্লাইদুবাই পুরোপুরি দুবাই সরকারের মালিকানাধীন। বিমান সংস্থাটি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয় দুবাই সরকার এবং এর মালিকানা বর্তমানে দুবাই সরকারের সার্বভৌম সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব দুবাই (আইসিডি)-এর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। অর্থাৎ ফ্লাইদুবাইয়ের মালিকানা কাঠামোর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ দুবাই সরকারের হাতেই রয়েছে।
ফ্লাইদুবাইকে পরিচালনার ক্ষেত্রে আলাদা করপোরেট কাঠামো ও ব্যবস্থাপনা রয়েছে। ফলে সরকারি মালিকানাধীন হলেও এটি একটি স্বতন্ত্র বাণিজ্যিক বিমান সংস্থা হিসেবে নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করে।
২০০৮ সালে যাত্রা শুরু
দুবাইয়ের বিমান পরিবহন খাতে একটি নতুন ও তুলনামূলক কম খরচের এয়ারলাইন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ২০০৮ সালে ফ্লাইদুবাই প্রতিষ্ঠিত হয়। সে সময় দুবাইকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের দেশগুলোর সঙ্গে বিমান যোগাযোগ আরও সহজ ও সাশ্রয়ী করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
পরবর্তী সময়ে ফ্লাইদুবাই দ্রুত নিজেদের গন্তব্য নেটওয়ার্ক বাড়াতে থাকে। দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে প্রধান ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে বর্তমানে বিমান সংস্থাটি মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। তাদের গন্তব্যের সংখ্যা বর্তমানে ১৩১টি বলে উল্লেখ করা হয়।
এমিরেটসের সঙ্গে ফ্লাইদুবাইয়ের সম্পর্ক কী?
ফ্লাইদুবাই ও এমিরেটসকে অনেক সময় একই বিমান সংস্থার দুটি শাখা হিসেবে মনে করা হলেও বাস্তবে তারা পৃথক প্রতিষ্ঠান। এমিরেটস একটি পূর্ণাঙ্গ সেবাদানকারী আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা, যেখানে ফ্লাইদুবাইয়ের ব্যবসায়িক মডেল তুলনামূলকভাবে কম খরচের বিমান পরিবহনের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়।
তবে দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি যোগসূত্র রয়েছে-তাদের চূড়ান্ত মালিকানা দুবাই সরকারের সঙ্গে সম্পর্কিত। ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব দুবাইয়ের মাধ্যমে ফ্লাইদুবাইয়ের মালিকানা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এ কারণে ফ্লাইদুবাইকে প্রায়ই এমিরেটসের ‘লো-কস্ট সিস্টার ক্যারিয়ার’ বা ‘সিস্টার এয়ারলাইন’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
তবে ‘সিস্টার ক্যারিয়ার’ বলা হলেও ফ্লাইদুবাই ও এমিরেটস একই প্রতিষ্ঠান নয়। দুটি বিমান সংস্থার নিজস্ব ব্যবস্থাপনা, ব্যবসায়িক কাঠামো ও পরিচালন ব্যবস্থা রয়েছে। অর্থাৎ একই মালিকানার সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেও তারা পৃথক এয়ারলাইন হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করে।
কী ধরনের উড়োজাহাজ ব্যবহার করে ফ্লাইদুবাই?
ফ্লাইদুবাইয়ের বহরে মূলত বোয়িং ৭৩৭ পরিবারের বিভিন্ন সংস্করণের উড়োজাহাজ রয়েছে। স্বল্প ও মাঝারি দূরত্বের রুটে পরিচালনার জন্য এই ধরনের উড়োজাহাজ বিশেষভাবে উপযোগী। কম খরচে বিভিন্ন আঞ্চলিক গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনার ব্যবসায়িক মডেলের সঙ্গে এই বহরও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এই বহরের ওপর নির্ভর করে ফ্লাইদুবাই দুবাই থেকে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন শহরের সঙ্গে সরাসরি বিমান যোগাযোগ তৈরি করেছে। এর ফলে দুবাইয়ের আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থায় এয়ারলাইনটির গুরুত্বও ক্রমেই বেড়েছে।
ফ্লাইদুবাইয়ের নিরাপত্তা রেকর্ড কেমন?
প্রতিষ্ঠার পর থেকে ফ্লাইদুবাইয়ের বহরে বড় ধরনের দুর্ঘটনার সংখ্যা সীমিত। তবে ২০১৬ সালের মার্চে বিমান সংস্থাটির একটি ফ্লাইট ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয়। এটি এখন পর্যন্ত ফ্লাইদুবাইয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুতর এবং প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা।
ফ্লাইদুবাইয়ের ফ্লাইট FZ981 দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে রাশিয়ার রোস্তভ-অন-ডন বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিল। অবতরণের সময় উড়োজাহাজটি একাধিকবার অবতরণের চেষ্টা করে। শেষ পর্যন্ত রানওয়ের কাছে গিয়ে উড়োজাহাজটি দুর্ঘটনার শিকার হয়।
দুর্ঘটনায় বোয়িং ৭৩৭-৮০০ উড়োজাহাজটিতে থাকা ৬২ জন-যাত্রী ও ক্রু-সকলেই নিহত হন। দুর্ঘটনার সময় ওই এলাকায় প্রতিকূল আবহাওয়া, প্রবল বাতাস ও কম দৃশ্যমানতা ছিল। ঘটনাটি ফ্লাইদুবাইয়ের নিরাপত্তা ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ ফ্লাইদুবাই?
দুবাইকে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ফ্লাইদুবাইয়ের ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে যেসব রুটে বড় পূর্ণাঙ্গ সেবাদানকারী এয়ারলাইন পরিচালনা করা তুলনামূলক ব্যয়বহুল, সেসব আঞ্চলিক ও স্বল্প-মাঝারি দূরত্বের রুটে ফ্লাইদুবাইয়ের কম খরচের মডেল কার্যকর হয়েছে।
এমিরেটসের সঙ্গে একই মালিকানার সূত্রে সম্পর্ক থাকায় দুটি এয়ারলাইনের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার সুযোগও তৈরি হয়েছে। তবে ফ্লাইদুবাইকে এমিরেটসের সরাসরি অধীনস্থ কোনো শাখা হিসেবে দেখার পরিবর্তে পৃথক বিমান সংস্থা হিসেবে দেখা বেশি সঠিক।
মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ-শেষ কথা
সবকিছু মিলিয়ে ফ্লাইদুবাই একটি স্বতন্ত্র বিমান সংস্থা হলেও এর মালিকানার চূড়ান্ত উৎস দুবাই সরকার। ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এটি দুবাইয়ের বিমান পরিবহন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব দুবাইয়ের মাধ্যমে মালিকানা কাঠামোর নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকায় ফ্লাইদুবাইয়ের সঙ্গে দুবাই সরকারের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
অন্যদিকে এমিরেটসের সঙ্গে ফ্লাইদুবাইয়ের সম্পর্ক মূলত একই মালিকানা কাঠামোর কারণে। দুটি এয়ারলাইন আলাদা প্রতিষ্ঠান এবং আলাদা ব্যবসায়িক মডেলে পরিচালিত হলেও দুটির চূড়ান্ত মালিকানা দুবাই সরকারের সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে ১৩১টি গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনার মাধ্যমে ফ্লাইদুবাই দুবাইকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে।