আইন আদালত

রাজসাক্ষী আসলে কী, কারা হতে পারেন, কী সুবিধা পান?


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৫, ১১:০২ পিএম

রাজসাক্ষী আসলে কী, কারা হতে পারেন, কী সুবিধা পান?
ছবি: সংগৃহীত

জুলাই-আগস্টে সংঘটিত আলোচিত হত্যাকাণ্ডের মামলায় নতুন মোড়—সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন নিজেই হলেন রাজসাক্ষী। বৃহস্পতিবার (১০ জুলাই) ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে তিনি বলেন, “এই হত্যাকাণ্ডে আমি জড়িত ছিলাম। সব রহস্য উন্মোচন করব। আমি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রাজসাক্ষী হতে চাই।”

এরপর বিকেলে নিরাপত্তার স্বার্থে তাকে কারাগারে একক সেলে রাখা হয়। এই ঘটনার পর অনেকের মনে প্রশ্ন—রাজসাক্ষী আসলে কী? কারা হতে পারেন? এবং এতে কী সুবিধা মেলে?

রাজসাক্ষী বলতে কী বোঝায়?

রাজসাক্ষী (Approver) হলো এমন এক আসামি, যিনি নিজ অপরাধ স্বীকার করে রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষ্য দেন এবং অপর আসামিদের বিরুদ্ধেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেন। মূলত, তিনি আদালতে রাষ্ট্রের পক্ষ হয়ে ‘সাক্ষী’ হয়ে ওঠেন।

রাজকালের প্রচলন থেকে শব্দটি এসেছে, যেখানে রাজা নিজেই ছিল মামলার বাদী। সে সময় যিনি রাজপক্ষে সাক্ষ্য দিতেন, তাকেই বলা হতো ‘রাজসাক্ষী’। আজকের দিনে তাকে বলা যায় ‘রাষ্ট্রের সাক্ষী’।

কারা রাজসাক্ষী হতে পারেন?

আইন অনুযায়ী, অপরাধে সহ-অপরাধী বা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত এমন কেউ যদি তদন্তের একপর্যায়ে স্বেচ্ছায় বা প্ররোচনায় অপরাধের স্বীকারোক্তিমূলক বিবৃতি দিয়ে অপর আসামিদের বিরুদ্ধেও তথ্য দেন—তবে তাকে রাজসাক্ষী ঘোষণা করা যায়।

এক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৩৭ ও ৩৩৮ ধারা অনুযায়ী, দায়রা আদালতে বিচারযোগ্য অথবা ১০ বছর পর্যন্ত দণ্ডনীয় অপরাধে জড়িত কেউ বিচারিক অনুমতি নিয়ে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ‘ক্ষমা’ পেতে পারেন।

রাজসাক্ষী হওয়ার প্রক্রিয়া-

১. আসামি আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে নিজে রাজসাক্ষী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।

২. রাষ্ট্রপক্ষ যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেয় যে তার সাক্ষ্য অপরাধ প্রমাণে সহায়ক হবে কিনা।

৩. আদালত যদি রাজি হয়, তাহলে আসামিকে রাজসাক্ষী হিসেবে ঘোষণা দেয় এবং তাকে কারাগারে ‘সুরক্ষিত একক সেলে’ রাখা হয় যাতে অন্য কেউ তাকে প্রভাবিত করতে না পারে।

৪. বিচার চলাকালীন রাজসাক্ষীর একক সাক্ষ্যে সাজা দেওয়া গেলেও তা একমাত্র সাক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হয় না। তাই আদালত সাধারণত অন্যান্য স্বতন্ত্র ও নিরপেক্ষ সাক্ষ্য বা প্রমাণ খোঁজেন।

আইনি সুবিধা কী?

রাজসাক্ষী হওয়ার বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কিছু আইনি সুবিধা পেয়ে থাকেন-

ক্ষমা: তার নিজের বিরুদ্ধে মামলা স্থগিত বা প্রত্যাহার করা হতে পারে।

সাজার হ্রাস: অনেক সময় অপরাধ স্বীকার করলেও তাকে আর সাজা দেওয়া হয় না বা শাস্তি হ্রাস পায়।

নিরাপত্তা: রাষ্ট্র তাকে নিরাপদে রাখে যেন অন্য আসামিরা কোনো হুমকি দিতে না পারে।

তবে, রাজসাক্ষী হয়ে মিথ্যা তথ্য দিলে ক্ষমা বাতিল হয় এবং তাকে মূল মামলায় আসামি হিসেবেই বিচার করা হয়।

রাজসাক্ষীর সাক্ষ্য কি যথেষ্ট?

সাক্ষ্য আইন (ধারা ১৩৩ ও ১১৪) অনুযায়ী, রাজসাক্ষীর একক সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে সাজা দেওয়া আইনসঙ্গত হলেও, আদালত চায় যেন তার বক্তব্য অন্যান্য প্রমাণ দ্বারা সমর্থিত হয়। কারণ, রাজসাক্ষী অনেক সময় অন্যদের ফাঁসানোর উদ্দেশ্যেও সাক্ষ্য দিতে পারেন। তাই বিচারকরা সাধারণত রাজসাক্ষীর কথা বিশেষ সতর্কতা ও সন্দেহের চোখে বিবেচনা করে থাকেন।

প্রসঙ্গত, রাজসাক্ষী হওয়া মানেই দায় এড়িয়ে যাওয়া নয়। বরং এটি বিচারিক ব্যবস্থার একটি কৌশল, যার মাধ্যমে অপরাধের মূল চক্রকে শনাক্ত ও শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের স্বতঃপ্রণোদিত রাজসাক্ষী হওয়ার এই ঘোষণা মামলার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।