জাতীয়

বিপ্লবী রক্তে উজ্জীবিত প্রতিবাদের আইকন ছিলেন হাদি: প্রধান উপদেষ্টা


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫, ১১:৩৯ এএম

বিপ্লবী রক্তে উজ্জীবিত প্রতিবাদের আইকন ছিলেন হাদি: প্রধান উপদেষ্টা
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ছবি: সংগৃহীত

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহিদ শরিফ ওসমান হাদিকে বিপ্লবী চেতনায় উজ্জীবিত প্রতিবাদের এক অনন্য আইকন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, কর্মের মধ্য দিয়ে হাদি শুধু প্রতিবাদই নয়, দেশপ্রেম, ধৈর্য ও দৃঢ়তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন।

বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে এসব কথা বলেন প্রধান উপদেষ্টা। শহিদ শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করে তিনি জাতির সামনে এই ভাষণ দেন।

ভাষণের শুরুতে ড. ইউনূস বলেন, “প্রিয় দেশবাসী, আমি আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক একটি সংবাদ নিয়ে। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখভাগের অকুতোভয় যোদ্ধা ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি আর আমাদের মাঝে নেই। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।”

তিনি জানান, সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান বালাকৃষ্ণান টেলিফোনে তাকে এই মর্মান্তিক সংবাদটি জানিয়েছেন। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদবিরোধী সংগ্রামের এই অমর সৈনিককে মহান আল্লাহ শহিদ হিসেবে কবুল করুন—এই দোয়া করি।”

হাদির অকাল মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে ড. ইউনূস বলেন, “ওসমান হাদির প্রয়াণ দেশের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক পরিসরে এক অপূরণীয় ক্ষতি। আমি তার রুহের মাগফিরাত কামনা করছি এবং তার শোকসন্তপ্ত স্ত্রী, একমাত্র সন্তান, পরিবার-পরিজন, স্বজন ও সহকর্মীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।”
তিনি আরও ঘোষণা দেন, শহিদ ওসমান হাদির স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানের দায়িত্ব সরকার গ্রহণ করবে।

প্রধান উপদেষ্টা ভাষণে জানান, শহিদ শরিফ ওসমান হাদির অকাল মৃত্যুতে আগামী শনিবার একদিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হবে। এ উপলক্ষে দেশের সব সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি ভবন এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে।

তিনি আরও বলেন, শুক্রবার বাদ জুমা দেশের সব মসজিদে শহিদ হাদির রুহের মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হবে। একই সঙ্গে অন্যান্য ধর্মের উপাসনালয়গুলোতেও বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হবে।

সিঙ্গাপুর সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ড. ইউনূস বলেন, “হাদির চিকিৎসায় সিঙ্গাপুর সরকার সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও পেশাদারিত্ব দেখিয়েছে। বিশেষ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান বালাকৃষ্ণান—যিনি একইসঙ্গে একজন চিকিৎসক—নিজে হাদির চিকিৎসা তদারকি করেছেন এবং আমাকে নিয়মিত খোঁজখবর দিয়েছেন।”

হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “এই নৃশংস হত্যার সঙ্গে জড়িত সব অপরাধীকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে এবং তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। এ বিষয়ে কোনো ধরনের শৈথিল্য দেখানো হবে না।”

দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আপনারা ধৈর্য ও সংযম বজায় রাখুন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পেশাদারিত্বের সঙ্গে তদন্ত চালাচ্ছে। রাষ্ট্র আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমি আবারও স্পষ্টভাবে বলতে চাই, ওসমান হাদি ছিলেন পরাজিত ফ্যাসিস্ট সন্ত্রাসীদের শত্রু। তার কণ্ঠ স্তব্ধ করে বিপ্লবীদের ভয় দেখানোর অপচেষ্টা সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হবে।”

ড. ইউনূস বলেন, বাংলাদেশ এখন গণতান্ত্রিক উত্তরণের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং শহিদ হাদি ছিলেন এই প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তার ইচ্ছা ছিল আসন্ন নির্বাচনে অংশ নিয়ে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে সক্রিয় ভূমিকা রাখা। “অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, তার এই স্বপ্ন অপূর্ণ রয়ে গেল। তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায় আজ পুরো জাতির কাঁধে,”—বলেন তিনি।

ভাষণের শেষাংশে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “এই শোকের মুহূর্তে আসুন আমরা শহিদ শরিফ ওসমান হাদির আদর্শ ও ত্যাগকে শক্তিতে পরিণত করি। অপপ্রচার ও গুজবে কান না দিয়ে, হঠকারী সিদ্ধান্ত এড়িয়ে, ঐক্যবদ্ধভাবে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যাই। এটিই হবে শহিদ হাদির প্রতি আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধা।”