জাতীয়

বেতন আড়াই গুণ বাড়ানোর সুপারিশে অসন্তুষ্ট উপদেষ্টারা


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০২:৫৪ পিএম

বেতন আড়াই গুণ বাড়ানোর সুপারিশে অসন্তুষ্ট উপদেষ্টারা
ছবি: সংগৃহীত

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন প্রায় আড়াই গুণ বাড়ানোর সুপারিশ করায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের অধিকাংশ উপদেষ্টা। এ অবস্থায় নবম জাতীয় বেতন কমিশনের প্রতিবেদন আপাতত প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি এ সংক্রান্ত বিষয়ে সর্বোচ্চ গোপনীয়তা রক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।

গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে তাঁর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে একাধিক উপদেষ্টা এই সুপারিশের বিরোধিতা করেন।

একজন উপদেষ্টা বৈঠকে বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই সময়ে কেবল সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন এত বড় অঙ্কে বাড়ানো হলে তা বৈষম্যমূলক হয়ে দাঁড়াতে পারে। সাধারণ মানুষের সীমিত আয়ের বাস্তবতা তুলে ধরে তিনি সরকারি কোষাগারের ওপর অতিরিক্ত চাপ না বাড়ানোর পক্ষে মত দেন। তার এই বক্তব্যে আরও দুইজন উপদেষ্টা একমত পোষণ করেন।

বৈঠকে একজন জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা বলেন, নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর না করার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর বড় রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে চাপ রয়েছে। তার মতে, বেতন কাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের জন্য রেখে দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন প্রায় আড়াই গুণ বাড়ানোর সুপারিশ করায় বেতন কমিশনের প্রতিও তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে আলোচনার পর বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পদ্ধতি নির্ধারণে একটি কমিটি গঠনের কথা থাকলেও উপদেষ্টাদের অসন্তুষ্টির কারণে সেই কমিটি আর গঠন করা হয়নি। ফলে এই সরকারের আমলে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সরকারের মেয়াদে এই সুপারিশ বাস্তবায়ন না হলে পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের অর্থমন্ত্রী বিষয়টি পর্যালোচনা করবেন। এরপর আন্তঃমন্ত্রণালয় পর্যালোচনার মাধ্যমে মন্ত্রিপরিষদে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পাঠানো হতে পারে। নির্বাচিত সরকার চাইলে প্রস্তাবটি পরিবর্তনও করতে পারবে।

এদিকে গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ জানান, বেতন কাঠামো বাস্তবায়নসংক্রান্ত কোনো কমিটি এখনো গঠন করা হয়নি। তিনি বলেন, কমিটি গঠন হলে বাস্তবায়নের কাজ শুরু হবে। তবে বেতন বাড়াতে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান কীভাবে আসবে—এ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে তিনি স্থান ত্যাগ করেন।

সূত্র জানায়, বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের বার্ষিক ব্যয় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। একই হারে পেনশন, চিকিৎসা ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাও বাড়বে।

বৈঠক সূত্রে আরও জানা গেছে, দুইজন উপদেষ্টা উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা ও নিচু স্তরের কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির পার্থক্য নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, বিদ্যমান বেতন কাঠামোয় মূলত নিম্ন ও মধ্যম স্তরের কর্মচারীরাই বেশি কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। অথচ নতুন প্রস্তাবেও কর্মচারীদের বিষয়টি যথাযথভাবে গুরুত্ব পায়নি।

নতুন প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী দশম গ্রেডে বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ৩২ হাজার টাকা এবং নবম গ্রেডে ৪৫ হাজার ১০০ টাকা। এতে দুই গ্রেডের মধ্যে পার্থক্য দাঁড়াচ্ছে ১৩ হাজার টাকা। অথচ ২০ থেকে ১১ গ্রেড পর্যন্ত বেতনের পার্থক্য মাত্র ৫ হাজার টাকা। আবার ২০, ১৯ ও ১৮ গ্রেডে বেতনের পার্থক্য মাত্র ৫০০ টাকা করে। গত বুধবার বেতন কমিশনের প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেওয়ার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে এ নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। গতকাল সচিবালয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মচারীরাও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদের মুখ্য সমন্বয়ক ওয়ারেছ আলী বলেন, পে-স্কেলের সুপারিশে সরকারি কর্মচারীদের মূল দাবি প্রতিফলিত হয়নি। তাদের প্রধান দাবি ছিল ১:৪ অনুপাতে গ্রেড পুনর্গঠন করে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৩৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা। কিন্তু বেতন কমিশনের প্রস্তাবে সেই দাবি বাস্তবায়িত হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।