সারাদেশ
জাজিরায় পদ্মা সেতু প্রকল্পের রক্ষা বাঁধে ভয়াবহ ভাঙন
বর্ষা মৌসুম শুরু হতেই শরীয়তপুরের জাজিরায় পদ্মা সেতু প্রকল্পের রক্ষা বাঁধে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ ভাঙন। গত সোমবার (৭ জুলাই) থেকে বুধবার (৯ জুলাই) সকাল পর্যন্ত মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বাঁধটির প্রায় ১৩০ মিটার অংশ পদ্মা নদীতে ধসে পড়ে, নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে অন্তত ১৬টি বসতবাড়ি ও ১০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।
ভাঙনের আশঙ্কায় আগেভাগেই সরিয়ে নেওয়া হয়েছে আরও ১৫টি দোকান।
স্থানীয়রা জানান, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বিপদে পড়বে হাটবাজার, ঘরবাড়ি, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও পুরো জনপদ। আতঙ্কে অনেকেই ইতোমধ্যে নদীর পাড় থেকে ঘরবাড়ি সরিয়ে নেওয়া শুরু করেছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানায়, ভাঙন রোধে জরুরি ভিত্তিতে কাজ শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে নদীর তীরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ স্থানে প্রায় এক হাজার জিও ব্যাগ ডাম্পিং করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পূর্ব সতর্কতায় ঘর সরিয়ে নেওয়া পরিবারগুলোকে দেওয়া হবে প্রয়োজনীয় সহায়তা।
ভাঙনের চিত্রে উঠে এসেছে মানবিক বিপর্যয়ের করুণ বাস্তবতা। জাজিরার মাঝিরঘাটের বাসিন্দা মিনাজ, বয়স মাত্র ১০ বছর, অথচ চোখে-মুখে ভেসে উঠেছে ভয়ের ছাপ আর অজানা শঙ্কা। তার চাচার দোকান নদীতে বিলীন হওয়ার আগেই বাঁচাতে মরিয়া হয়ে কাজ করছিল সে। স্থানীয় মিজান বলেন, “গাং ভাঙতাছে অনেক, আমরা বিপদে আছি। আমাদের ঘর-দোকান পানিতে চলে যাচ্ছে, আমাদের বাঁচান।”
এই ভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটছে আলম খার কান্দি, উকিল উদ্দিন মুন্সি কান্দি ও ওছিম উদ্দিন মুন্সি কান্দি গ্রামের প্রায় ৬০০ পরিবার।
স্থানীয় সূত্র ও পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, ২০১০-১১ অর্থবছরে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ পদ্মা সেতু প্রকল্পের আওতায় মাঝিরঘাট থেকে পূর্ব নাওডোবা হয়ে জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত ২ কিলোমিটার দীর্ঘ রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করে। এই প্রকল্পে ব্যয় হয় প্রায় ১১০ কোটি টাকা।
তবে গত বছরের ৩ নভেম্বর থেকে বাঁধের মাঝিরঘাট এলাকায় ধস শুরু হয়। এরপর একের পর এক ধসে পড়ে প্রায় ১০০ মিটার অংশ। বাঁধের নিচে কংক্রিটের সিসি ব্লকগুলো পানিতে তলিয়ে যায়, আশপাশে দেখা দেয় ফাটল। পরবর্তীতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে দেওয়া হয় বাঁধ সংস্কারের দায়িত্ব।
সংস্কারের অংশ হিসেবে ২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ে বালু ভর্তি জিও ব্যাগ ও সিসি ব্লক ফেলা হয়। কিন্তু চলতি বছরের ঈদের দিন ভোরে আবারও ওই সংস্কার করা বাঁধে নতুন করে প্রায় ২৫০ মিটার অংশ নদীতে ধসে পড়ে।
এরপরও পানি উন্নয়ন বোর্ড নতুন করে জিও ব্যাগ ডাম্পিং শুরু করে। কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার আগেই আবারও সোমবার (৭ জুলাই) বিকেলে বাঁধে দেখা দেয় নতুন ভাঙন। এতে আরও ২৬টি স্থাপনা পদ্মায় বিলীন হয়ে যায়।
অতীতের অভিজ্ঞতা ও বর্তমান বিপর্যয় বিবেচনায় স্থানীয়রা বলছেন, স্থায়ী সমাধান ছাড়া পদ্মার ভাঙন রোধ করা সম্ভব নয়। জরুরি ভিত্তিতে টেকসই বাঁধ নির্মাণ এবং পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনার দাবি জানাচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।