সারাদেশ

বিয়ের জন্য চাপ দেওয়ায় গৃহবধূকে শ্বাসরোধে হত্যা, মরদেহে পেট্রল ঢেলে আগুন


সারাদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬, ১১:৩৩ পিএম

বিয়ের জন্য চাপ দেওয়ায় গৃহবধূকে শ্বাসরোধে হত্যা, মরদেহে পেট্রল ঢেলে আগুন
ছবি: সংগৃহীত

দুধ কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে গৃহবধূ মেরিনার (৪৫) সঙ্গে পরিচয় হয় সাবেক ইউপি সদস্য বাবুল হোসেনের (৪৬)। একসময় দুজনের মধ্যে মোবাইলে কথার আদান-প্রদান হতে হতে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সম্পর্ক খুব গভীর হয়ে উঠলে বিয়ের জন্য চাপ দিতে থাকে গৃহবধূ মেরিনা। একপর্যায়ে মেরিনাকে বিয়ের আশ্বাসে আম বাগানে ডেকে নেয় বাবুল হোসেন। এরপর বাবুল হোসেন ও অন্য তিন সহযোগী মিলে মেরিনাকে শ্বাসরোধে হত্যার পর গায়ে পেট্রল ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে।

এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় হতাকা-ের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বাবুল হোসেনসহ দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার অপর ব্যক্তি হলেন, ধামইরহাট সদর ইউনিয়নের মড়ইল গ্রামের মোজাম্মেল হকের ছেলে তারেক রহমান (২১)।

ওই গৃহবধূর লাশ উদ্ধারের দুই দিন পর আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে নওগাঁর পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম তার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এসব তথ্য জানান। এসময় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম, জয়ব্রত পাল, জিন্নাহ আল মামুন ও শরিফুল ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ধামইরহাট উপজেলার আগ্রাদ্বিগুন ইউনিয়নের তালপুকুর মাহমুদপুর গ্রামের একটি মাঠে আমবাগান থেকে গৃহবধূ মেরিনার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত মেরিনা বেগম উপজেলার খেলনা ইউনিয়নের দিঘিপাড়া গ্রামের হাসান আলীর স্ত্রী।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, “মেরিনার স্বামী হাসান আলী ও তার ছেলে কাউসার আলী জীবিকার নির্বাহের জন্য কুমিল্লায় থাকেন। মেরিনা ঘর-সংসার দেখাশোনার পাশাপাশি বাড়িতে গরু লালন-পালন করতেন। তিনি মানুষের বাড়ি গরুর দুধ বিক্রি করতেন। গরুর দুধ কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে ধামরইহাটের মড়ইল গ্রামের বাসিন্দা ও ধামইরহাট সদর ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্যকে বাবুল হোসেনের সঙ্গে মেরিনার পরিচয় হয়। বাবুল হোসেন কৌশলে মেরিনার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তাদের মধ্যে মোবাইলে কথা আদান-প্রদান হতো। সম্পর্ক যখন খুব গভীর হযয়ে যায়, তখন মেরিনা বিয়ের জন্য বাবুলকে চাপ দিতে থাকে। বিয়ে না করলে, আত্মহত্যার করার হুমকিও দেন। একপর্যায়ে বাবুল হোসেন মেরিনাকে বিয়ের আশ্বাস দেন।

বাবুল হোসেন মুঠোফোনে মেরিনাকে বলেন, ‘আগামী ১৬ আগস্ট তোমাকে বিয়ে করব। তুমি সকল প্রস্তুতি নিয়ে আসো।’ বিয়ের আশ্বাস পেয়ে মঙ্গলবার দুপুর বেলা মেরিনা বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। বাড়ি থেকে বের হওয়ার জামাকাপড় ও প্রসাধনী ছাড়াও নিজের জাতীয় পরিচয়পত্রও সঙ্গে নেন মেরিনা। ওই দিন বাবুল ও তাঁর অন্য তিন সহযোগী মিলে ধামইরহাট উপজেলার তালপুকুর মাহমুদপুর গ্রামের ভলকাডাঙ্গা মাঠের একটি আম বাগানে ডেকে নিয়ে প্রথমে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। এরপর আলামত ধ্বংস করার জন্য মেরিনার শরীরে পেট্রল ঢেলে আগুন জ¦ালিয়ে পুড়িয়ে দেয়।”

পুলিশ সুপার বলেন, ‘মেরিনা বিয়ের জন্য চাপ দিতে থাকলে এক সময় ইউপি সদস্য বাবুল হোসেন তাকে হত্যার জন্য পরিকল্পনা আঁটতে থাকে। পরিকল্পনা মোতাবেক বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে মঙ্গলবার মেরিনাকে ডেকে নেয় বাবুল হোসেন। মঙ্গলবার দুপুর বেলা মেরিনা বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। এর মধ্যে পরিকল্পনা মোতাবেক বাবুল তার সহযোগীকে শাহপুরে মোড়ে পাঠায় মেরিনাকে নেওয়ার জন্য। শাহাপুর থেকে মেরিনাকে নিয়ে তারা রাত ১০টার দিকে আগ্রাদ্বিগুন বাজারে নিয়ে আসে। এরপর তাদের সঙ্গে সেখানে বাবুল মেম্বার একত্রিত হয়। সেখান থেকে তারা মোটরসাইকেল ও অটোরিকশা করে তালপুকুর মাহমুদপুর গ্রামের ভলকাডাঙ্গা মাঠের একটি আমবাগানে মেরিনা নিয়ে যায়। রাস্তা নামিয়ে আমবাগানের মধ্যে নিয়ে যাওয়ার সময় মেরিনা তাদের সঙ্গে যেতে না চাইলে তাঁকে ধাক্কাধাক্কি করে সেখানে নিয়ে যায় তারা। সেখানে নিয়ে যাওয়ার পর বাবুল মেম্বারের নির্দেশে আসামি তারেক ও অন্য এক সহযোগী মেরিনার গলায় বেল্ট পেঁচিয়ে দুইজন দুই দিক থেকে টান দেয়। মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা বেল্ট টেনে ধরে থাকে। একপর্যায়ে মেরিনা মারা গেলে তাঁরা আশপাশ থেকে খড়খুটো সংগ্রহ করে এবং মেরিনার শরীরে পেট্রল ঢেলে আগুন জ¦ালিয়ে দেয়।’ 

এসপি তারিকুল ইসলাম বলেন, শুরুর দিকে ঘটনাটি পুলিশের কাছে ক্লুলেস ছিল। বিষয়টা আমরা খুব গুরুত্বের সহকারে নিয়ে তদন্ত কাজ শুরু করি। তথ্যপ্রযুক্তি, স্থানীয় তদন্ত এবং ডাটা বিশ্লেষণ করে আমাদের কয়েকজনকে সন্দেহ হয়। এই সন্দেহের ভিত্তিতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শরিফুল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল গতকাল বুধবার দিবাগত রাতে উপজেলার মড়ইল গ্রামে অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত বাবুল মেম্বারকে তার বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই গ্রামের বাসিন্দা তারেক রহমানকে (২১) গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যাকা-ের কথা পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে। এই হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত অপর দুইজনকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।