সারাদেশ
রেলপথে রংপুরের মানুষের দুর্ভোগ: টিকিট পেতে যুদ্ধ প্রতিদিন
রংপুর রেলওয়ে স্টেশন- প্রায় দেড় শতাব্দীর পুরোনো এই স্টেশন এখন বিভাগীয় শহরের কেন্দ্রবিন্দু। ১৮৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই রেলস্টেশনের নাম ও মর্যাদা বাড়লেও উন্নয়নের ছোঁয়া যেন বহুদিন ধরেই অনুপস্থিত। অবকাঠামোগত দুরবস্থা, ট্রেনের স্বল্পতা ও টিকিট সংকটে এখন রংপুরবাসীর কাছে রেলযাত্রা পরিণত হয়েছে চরম দুর্ভোগে।
রংপুর থেকে ঢাকাগামী ট্রেন মাত্র দুটি—রংপুর এক্সপ্রেস এবং কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস। দুটি ট্রেনে মিলে রংপুর থেকে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে ৬০০ যাত্রী যাতায়াত করেন। এর মধ্যে কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসে রংপুরের জন্য বরাদ্দ আসন মাত্র ১৫৪টি, আর রংপুর এক্সপ্রেসে ১৯৯টি। ফলে টিকিট পাওয়া যেন ভাগ্যের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যাত্রীদের অভিযোগ, কর্তৃপক্ষ যাত্রীচাহিদার মাত্র ২০ ভাগ টিকিটও দিতে পারছে না। অনলাইন ও কাউন্টার—দুই মাধ্যমেই টিকিট পেতে চলছে একরকম যুদ্ধ।
রেলযাত্রী নূর মোহাম্মদ, ষাটোর্ধ্ব এই প্রবীণ বলেন, “কাউন্টারে গেলে বলে টিকিট নাই, অনলাইনে কাটেন। আমি অনলাইন বুঝি না। তাহলে আমি যাব কোথায়? আমাদের কষ্ট দেখার কেউ নাই।”
আরেক যাত্রী মুনমুন রহমান জানান, “স্টেশনের অবস্থা বেহাল। নেই যাত্রীছাউনি, পারাপারের জন্য নেই ফুটওভার ব্রিজ, দ্বিতীয় প্ল্যাটফর্মে যেতে কষ্ট হয়। টিকিটের জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করতে হয়। অনলাইনেও সমস্যা শেষ হয় না।”
রংপুর রেলস্টেশনে সর্বশেষ সংস্কার কাজ হয় ১৯৪৪ সালে—তাও দায়সারাভাবে। এরপর শত বছর পার হলেও বিভাগীয় শহরের এই গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনটি এখনো পড়ে আছে অবহেলায়। নেই পর্যাপ্ত বসার জায়গা, ভাঙা টয়লেট, অরক্ষিত বাউন্ডারি দেয়াল ও অপ্রতুল নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
স্থানীয় বাসিন্দা কামরুল হাসান বলেন, “বিভাগীয় স্টেশন হলেও এখানে কোনো কার্যক্রম নেই। অন্তত আরেকটি ট্রেন বাড়িয়ে কাউন্টারে টিকিট বিক্রি করলে যাত্রীদের কিছুটা স্বস্তি মিলত।”
নিয়মিত যাত্রী মোখলেছুর রহমান বলেন, “অনলাইনেও টিকিট পাওয়া কঠিন। আগেই সব বুক হয়ে যায়, কখনো আবার সিন্ডিকেট করে রাখে। নেটওয়ার্কের সমস্যা তো আছেই। আমরা কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছি না।”
রংপুর নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, রেল কর্তৃপক্ষের দীর্ঘদিনের উদাসীনতা এখন রংপুরবাসীর ক্ষোভে রূপ নিয়েছে।
ওয়াদুদ আলী, রংপুর বিভাগ উন্নয়ন আন্দোলন পরিষদের আহ্বায়ক, বলেন- “১৯৪৪ সালের পর থেকে আজ পর্যন্ত রংপুর রেলওয়ে স্টেশনে কোনো দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়নি। এটি বিভাগীয় শহরের জন্য চরম অবহেলা।”
রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব পলাশ কান্তি নাগ মনে করেন, “দেশ যখন মেট্রোরেলের যুগে, তখন রংপুরবাসী এখনো রেলের যুগের দুর্ভোগে আটকে আছে। উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম রেলকে আধুনিক করা এখন সময়ের দাবি। আমরা দ্রুত স্টেশনের সংস্কার ও আরও দুটি আন্তঃনগর ট্রেন সংযোজন চাই।”
রংপুর রেলওয়ে স্টেশনের ভারপ্রাপ্ত সুপারিনটেনডেন্ট আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “ঢাকাগামী ট্রেনের টিকিট ১০ দিন আগে থেকে অনলাইনে বিক্রি শুরু হয়। যেহেতু এখন শতভাগ টিকিট অনলাইনেই বিক্রি হচ্ছে, আলাদা কোনো বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব নয়। আমরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি, তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।”
নাগরিক সমাজের অভিমত-দেশ যখন দ্রুতগতির ট্রেন, মেট্রোরেল ও হাইস্পিড রেল যুগে এগিয়ে চলেছে, তখন রংপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরের রেলসেবা যেন সময়ের চাকা থেকে পিছিয়ে পড়েছে। ট্রেনের সংখ্যা ও টিকিট বরাদ্দ না বাড়ালে উত্তরাঞ্চলের মানুষের এই ভোগান্তির শেষ নেই।