বিজ্ঞান-তথ্যপ্রযুক্তি
এআই ২০২৬ সালে মানুষের কর্মসংস্থানে যা যা প্রভাব ফেলবে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশ্বজুড়ে কর্মক্ষেত্রকে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তনের মুখে এনে দাঁড় করিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আর্থিক সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি-র শীর্ষ মানবসম্পদ কর্মকর্তাদের এক গুরুত্বপূর্ণ জরিপে উঠে এসেছে, আগামী বছর প্রায় ৮৯ শতাংশ চাকরিতেই এআইয়ের সরাসরি প্রভাব পড়বে।
এই প্রযুক্তি শুধু যন্ত্রপাতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে মানুষের কাজের ধরন, নেতৃত্ব ও উদ্ভাবনী ক্ষমতাকেও নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছে।
জরিপে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা মনে করছেন, এআই চাকরির অর্ধেকেরও বেশি ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলবে। সংস্থাগুলো ইতিমধ্যেই কর্মীদের কাজের ধরন পুনর্বিন্যাস করতে শুরু করেছে। পুনরাবৃত্তিমূলক কাজগুলি এখন এআই দ্বারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হচ্ছে, যার ফলে কর্মীরা বেশি সৃজনশীল এবং কৌশলগত কাজে মনোযোগ দিতে পারছেন।
সিএনবিসি-র গবেষণা অনুযায়ী, এআই ব্যবহার করে কর্মীরা প্রতি সপ্তাহে গড়ে ৭.৫ ঘণ্টা সময় সাশ্রয় করতে পারছেন। জরিপে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে ৬১ শতাংশ মনে করছেন, এআই তাদের সংস্থাকে আরও দক্ষ ও উৎপাদনশীল করেছে, এবং ৭৮ শতাংশ মনে করেন, এটি উদ্ভাবনী ক্ষেত্রে সংস্থাকে শক্তিশালী করেছে।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আসছে বড় ধরনের বদল। জরিপে এক কর্মকর্তা জোর দিয়ে বলেছেন, ভবিষ্যতে চাকরি প্রাপ্তি শুধু প্রথাগত ডিগ্রি বা শিক্ষাগত যোগ্যতার ওপর নির্ভর করবে না। বরং, এআই-সহায়ক দক্ষতা অনুযায়ী নিয়োগ আরও বৃদ্ধি পাবে। তথ্যপ্রযুক্তি, মিডিয়া, ব্যাংকিং, কল সেন্টার ও তৈরি পোশাক খাতগুলোয় এআইয়ের প্রয়োগ এখন দ্রুততর হচ্ছে।
কর্মী ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা থাকলেও জরিপে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, এই ছাঁটাই মূলত সংস্থার খরচ নিয়ন্ত্রণের কারণে হবে, সরাসরি এআই-এর দক্ষতা বৃদ্ধির কারণে নয়। অর্থাৎ, এআই দক্ষতা বৃদ্ধি করলেও এটি চাকরি হ্রাসের মূল কারণ নয়, বরং কর্মীদের জন্য আরও সৃজনশীল কাজের সুযোগ তৈরি করছে।
বিশ্বের পাশাপাশি বাংলাদেশেও চাকরির মানচিত্রে পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে। তবে দেশের চাকরিপ্রার্থী ও প্রতিষ্ঠানগুলির জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এআই এর ব্যাবহার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবশ্যই নীতি প্রণয়ন, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে প্রস্তুতি নিতে হবে।
বিশেষ করে, তথ্যপ্রযুক্তি, কল সেন্টার ও তৈরি পোশাক খাতে কর্মীদের এআই ব্যবহার করে দক্ষতা বৃদ্ধি ও উদ্ভাবন শেখানোর ওপর জোর দিতে হবে।
এদিকে এআইয়ের কারণে ২০২৬ সালের মধ্যে চাকরি হারাতে পারে যে ৫ পেশার মানুষ:
কিছু বিশেষজ্ঞ বলছেন, ২০২৬ সালের মধ্যে পাঁচটি পেশা এআই দখল করে নেবে। এটা কিন্তু শুধু ভবিষ্যদ্বাণী নয়, ইতিমধ্যে বাস্তব হতে চলেছে। চলুন সেই পেশাগুলো সম্পর্কে জেনে নিই।
১. আইনের সমাধান রোবটের নখদর্পণে
একসময় চুক্তিপত্র পর্যালোচনার জন্য আইনজীবীরা ঘণ্টায় ৫০-৬০ হাজার টাকা নিতেন। তবে সেই দিন এখন অতীত। এআই এখন মানুষের চেয়ে দ্রুত এবং নির্ভুলভাবে চুক্তিপত্র পর্যালোচনা করতে পারে। একজন জুনিয়র আইনজীবী দিনে সর্বোচ্চ ২০টি চুক্তি পর্যালোচনা করতে পারে। কিন্তু এআই একই সময়ে ২ হাজারের বেশি চুক্তি পর্যালোচনা করে ৯৯.৭ শতাংশ নির্ভুলতার সঙ্গে। এই তুলনা দেখলেই বোঝা যায়, এই কতটা বিপ্লব ঘটিয়েছে।
২. হিসাব করবে এআই
আপনার কাজ যদি হয় স্প্রেডশিট বা হিসাব মেলানো, তাহলে ভবিষ্যতে আপনার চাকরি যাওয়ার আশঙ্কা আছে। মাইন্ডব্রিজ এবং অ্যাপজেনের মতো এআই অ্যাকাউন্টিং সফটওয়্যার এখন জালিয়াতি শনাক্ত করতে পারে, বিল প্রসেসিং করতে পারে, এমনকি আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করতে পারে। আর এসব কাজ করতে পারে যেকোনো মানুষের চেয়ে দ্রুত। তাছাড়া এসব সফটওয়্যারের কফি বিরতি নিতে হয় না। হিসাবেও ভুল করে না বললেই চলে। কাজ করতে পারে টানা ২৪ ঘণ্টা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টাকা যে বেঁচে যাবে, তা আর বলতে। এমন সুযোগ থাকতে কোম্পানিগুলো কেন এআইয়ের পরিবর্তে মানুষকে চাকরি দেবে বলুন তো!
৩. স্বাস্থ্যসেবার কাজ দখল
চিকিৎসক এবং নার্সরা চাকরিতে নিরাপদ থাকলেও স্বাস্থ্যসেবার বিশাল প্রশাসনিক কর্মীবাহিনী এআইয়ের কাছে দ্রুত চাকরি হারাবে। মেডিকেল কোডার, ইন্স্যুরেন্স ক্লেইম প্রসেসর, ডেটা এন্ট্রি অপারেটরদের, রোগীর তথ্য প্রবেশ—এসব কাজ এআইয়ের সাহায্যে আরও দ্রুত করা যাবে। এআইয়ের রোগীদের মন বুঝে ভালো ব্যবহার করার দরকার নেই, শুধু দ্রুত কাজ করতে পারলেই হলো। অ্যানথেম নামে একটি কোম্পানি এআই ব্যবহার করে বছরে ২০ কোটির বেশি মেডিকেল ক্লেইম প্রসেস করেছে। আগে এই কাজ করতে সপ্তাহ লেগে যেত। এখন করা যাচ্ছে কয়েক মিনিটে।
৪. কল সেন্টারে কথা বলবে যন্ত্র
শিগগিরিই কাস্টমার সার্ভিস প্রতিনিধিরা চাকরি হারাবেন। এআই চ্যাটবট এবং ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্টগুলো এখন মানুষের সহায়তা ছাড়াই ৮০ শতাংশ গ্রাহককে সাহায্য করছে। এগুলো কখনো বিরক্ত হয় না, অসুস্থ হয়ে ছুটি নেয় না এবং হাজার হাজার গ্রাহককে একসঙ্গে সাহায্য করতে পারে। তাই ভবিষ্যতে হয়তো আপনি কল সেন্টারে কল করলে মানুষের পরিবর্তে কোনো যন্ত্রের সঙ্গে কথা বলবেন। সেই যন্ত্র মানুষের চেয়ে জ্ঞানী না হলেও বেশি ধৈর্যশীল হবে।
৫.কন্টেন্ট তৈরি এবং ডেটা ব্যবস্থাপনা
কন্টেন্ট তৈরি এবং ডেটা ব্যবস্থাপনার মতো কাজগুলোকে একসময় মানুষের নিজস্ব জগৎ বলে মনে হতো। কিন্তু চ্যাটজিপিটি বা জেমিনির মতো এআই মডেলগুলো সেই ভাবনাকে ভুল প্রমাণ করেছে। মানুষের চেয়ে অনেক দ্রুত এআই কন্টেন্ট তৈরি করে দিতে পারে। তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদন তৈরিতেও এআই বেশ পটু।
তাই ভবিষ্যতে লেখক, সম্পাদক, সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজার, ডেটা এন্ট্রি স্পেশালিস্ট এমনকি বেসিক গ্রাফিক ডিজাইনারদেরও চাকরি হারানোর ঝুঁকি আছে।
সুতরাং এআই যেমন বিপ্লব ঘটাতে সক্ষম তেমনি তা মানুষের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কর্মসংস্থানের জন্য বিশাল ঝুকিও বহন করে।