বিজ্ঞান-তথ্যপ্রযুক্তি

পৃথিবীর ভূ-অভ্যন্তরে সকল মহাসাগরের চেয়ে বিশাল জলের ভান্ডার আবিষ্কার 


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:৫৯ পিএম

পৃথিবীর ভূ-অভ্যন্তরে সকল মহাসাগরের চেয়ে বিশাল জলের ভান্ডার আবিষ্কার 
ছবি: সংগৃহীত

মহাদেশীয় ভূত্বকের নিচে ঠিক কী রয়েছে, তা নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। বিজ্ঞানীরা ভূমিকম্পের তরঙ্গ বিশ্লেষণ এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পৃথিবীর অভ্যন্তরীন গঠন সম্পর্কে যে চিত্র তুলে ধরেছেন, তা এক কথায় শ্বাসরুদ্ধকর।

পৃথিবীর গভীরতম অংশটি আমাদের পৃষ্ঠের পরিবেশ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন—অত্যন্ত উষ্ণ এবং অবিশ্বাস্য চাপে পূর্ণ।

সাম্প্রতিক গবেষণায় একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন যে গুরুমণ্ডল (Mantle)-এর গভীরে, ট্রানজিশন জোনে (Transition Zone) প্রচুর পরিমাণে জল কঠিন শিলার মধ্যে আবদ্ধ রয়েছে। এই জল তরল আকারে না থাকলেও এটি খনিজগুলির (যেমন রিংউডাইট) স্ফটিক কাঠামোর মধ্যে আটকে থাকে।

biggan 1.jpg
পৃথিবীর সমস্ত মহাসাগরের সম্মিলিত জলের পরিমাণের চেয়েও বেশি জল রয়েছে গুরুমন্ডলে।

অনুমান করা হয় যে, পৃথিবীর পৃষ্ঠের সমস্ত মহাসাগরের সম্মিলিত জলের পরিমাণের চেয়েও বেশি জল এই গুরুমণ্ডলের গভীরে জমা থাকতে পারে। এই ভূ-অভ্যন্তরীণ জল পৃথিবীর রাসায়নিক গঠন এবং টেকটোনিক প্লেটের সঞ্চালনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর অভ্যন্তরকে মূলত তিনটি স্তরে ভাগ করেছেন:

ভূত্বক (Crust): এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বাইরের ও পাতলা স্তর, যা মহাদেশীয় এবং মহাসাগরীয় শিলা দ্বারা গঠিত। ভূত্বকের নিচের দিকে প্রতি কিলোমিটারে তাপমাত্রা প্রায় ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস করে বাড়ে।

গুরুমণ্ডল (Mantle): ভূত্বকের নিচে অবস্থিত এই স্তরটি প্রায় ২৯০০ কিলোমিটার গভীর এবং পৃথিবীর মোট আয়তনের প্রায় ৮৩%। এই অংশে গলিত পাথর বা ম্যাগমা থাকে, যার তাপমাত্রা ১০০০°C থেকে ৪০০০°C পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এই স্তরের পরিচলন স্রোতই পৃথিবীর প্লেটগুলিকে নড়াচড়া করায়।

কেন্দ্রমণ্ডল (Core): এটি পৃথিবীর কেন্দ্রস্থল। এর তাপমাত্রা ও চাপ পৃথিবীর অন্যান্য স্তরের তুলনায় বহুগুণ বেশি।

১২ ডিসেম্বর বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্সে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়, পৃথিবী সৃষ্টির শুরুতে প্রায় ৪৬০ কোটি বছর আগে গ্রহটির পৃষ্ঠ ছিল গলিত ম্যাগমায় (magma ocean) ঢাকা। সেই সময় উচ্চ তাপমাত্রায় তৈরি হওয়া ব্রিজম্যানাইট তার ভেতরে বিপুল পরিমাণ পানি আটকে রাখতে সক্ষম হয়েছিল।

sagor.jpg
পৃথিবীর ভূ-অভ্যন্তরে সকল মহাসাগরের চেয়ে বিশাল জলের ভান্ডার আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের। 

এই ধারণা যাচাই করতে বিজ্ঞানীরা বিশেষ পরীক্ষাগারে ডায়মন্ড অ্যানভিল সেল (অত্যন্ত উচ্চ চাপ তৈরি করার যন্ত্র) ব্যবহার করেন। লেজার দিয়ে উত্তপ্ত করে ৪ হাজার ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা ও বিপুল চাপ সৃষ্টি করা হয়। এতে দেখা যায়, এত বেশি তাপে ব্রিজম্যানাইটের গঠন এমনভাবে বদলায় যে পানির অণু (water molecules) সহজেই তার ভেতরে ঢুকে যায়।

আগের গবেষণায় ধারণা ছিল, এই খনিজে পানির পরিমাণ ছিল প্রতি মিলিয়নে ২২০ ভাগের কম। নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর নিচের ম্যান্টলে (lower mantle) জমে থাকা পানির পরিমাণ বর্তমান সব মহাসাগরের মোট পানির ০.০৮ থেকে ১ গুণ পর্যন্ত হতে পারে।

বিজ্ঞানীদের মতে, এই গভীর পানিই পৃথিবীর ভূ-অভ্যন্তরের চলাচল সহজ করেছে। এটি শিলাকে নরম করেছে, গলনাঙ্ক কমিয়েছে এবং প্লেট টেকটনিকস (plate tectonics—ভূত্বকের প্লেটের চলাচল) সক্রিয় রেখেছে। দীর্ঘ সময়ে এই পানি আগ্নেয়গিরির মাধ্যমে উপরে উঠে এসে বায়ুমণ্ডল ও মহাসাগর গঠনে ভূমিকা রেখেছে।

গবেষকরা বলছেন, পৃথিবীর পানির উৎস বোঝার পথে এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।