সারাবিশ্ব

নেপালে ছোট বোনকে পিঠে বেঁধে বাবা-মাকে খুঁজছে খুদে বালক, যেন নাগাসাকির সেই স্মৃতি


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৪১ পিএম

নেপালে ছোট বোনকে পিঠে বেঁধে বাবা-মাকে খুঁজছে খুদে বালক, যেন নাগাসাকির সেই স্মৃতি
ছবি: সংগৃহীত

পিঠে দুধের শিশুকে কাপড় দিয়ে বেঁধে কাদামাখা পথে হেঁটে চলেছে এক খুদে বালক। শরীরজুড়ে কাদা, চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ। তবু থামার কোনো সুযোগ নেই। পিঠে থাকা ছোট বোনটি কাঁদছে, আর চারপাশে তাকিয়ে মা-বাবাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে শিশুটি। নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে দাবি করা এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। হৃদয়বিদারক দৃশ্যটি অনেকের মনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের নাগাসাকিতে ধারণ করা ঐতিহাসিক সেই ছবিটির কথা মনে করিয়ে দিয়েছে, যেখানে এক খুদে বালক তার মৃত ছোট বোনকে পিঠে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটিতে দেখা যায়, অল্প বয়সী একটি ছেলে তার ছোট বোনকে পিঠে বেঁধে নিয়ে কাদামাখা পথ ধরে হাঁটছে। পিঠে থাকা শিশুটিকে দেখে বোঝা যায়, সে এখনও দুধের শিশু। ভিডিওতে তাকে কান্নাকাটি করতে দেখা যায়। ক্ষুধা, ভয়, অসুস্থতা কিংবা বিপর্যয়ের আতঙ্ক-কোন কারণে শিশুটি কাঁদছে, তা ভিডিও থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

বালকটির শরীর ও পোশাকে কাদা লেগে রয়েছে। মুখেও স্পষ্ট ক্লান্তির ছাপ। দীর্ঘ সময় ধরে হাঁটার কারণে সে পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছে বলেই মনে হচ্ছে। তারপরও ছোট ছোট পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে সে। কখনো সামনে, কখনো ডানে-বাঁয়ে তাকাচ্ছে। তার চলাফেরা দেখে মনে হচ্ছে, মানুষের ভিড় কিংবা ধ্বংসস্তূপের কোথাও হয়তো মা-বাবাকে খুঁজে পাওয়ার আশায় পথ চলছে সে।

ভিডিওটি গত রবিবার থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। @JeetN25 নামের এক ব্যবহারকারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ভিডিওটি পোস্ট করেন। ক্যাপশনে তিনি লেখেন, ‘নেপালের হৃদয়বিদারক দৃশ্য। একটি ছোট ছেলে তার বোনকে পিঠে নিয়ে মা-বাবাকে খুঁজছে।’ পোস্টে শিশু দুটির মুখের কষ্ট ও শরীরে থাকা আঘাতের চিহ্নের কথাও উল্লেখ করা হয়।

ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর অসংখ্য মানুষ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছেন। অনেকেই শিশু দুটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ তাদের মা-বাবার সঙ্গে দ্রুত পুনর্মিলন কামনা করে প্রার্থনা করেছেন। আবার অনেকে এত অল্প বয়সে একটি শিশুকে এমন কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে-এ নিয়ে গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজন ব্যবহারকারী প্রশ্ন তুলেছেন, ‘এত অল্প বয়সে জীবনের বোঝা এত ভারী হয়ে যায় কেন?’ আরেকজন বালকটির সাহসের প্রশংসা করে লিখেছেন, ‘শক্ত থেকো ছোট্ট নায়ক। নেপালের জন্য প্রার্থনা করছি।’

তবে আবেগঘন এই ভিডিওটি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় রয়েছে। ভিডিওটি নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয়েরই দৃশ্য কি না, তা এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। ভিডিওটির সুনির্দিষ্ট স্থান, ধারণের সময় এবং শিশু দুটির পরিচয়ও যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবিকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে বিবেচনা না করে সতর্কতার সঙ্গে দেখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

তারপরও ভিডিওটির দৃশ্য মানুষের মনে গভীর দাগ ফেলেছে। বিশেষ করে পিঠে ছোট বোনকে বহন করে এক শিশুর অসহায়ভাবে পথ চলার দৃশ্য অনেকের মনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে।

নাগাসাকির ঐতিহাসিক ছবির সঙ্গে তুলনা

ভিডিওটি ঘিরে আলোচনার অন্যতম কারণ হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের নাগাসাকিতে ধারণ করা একটি ঐতিহাসিক ছবির সঙ্গে এর দৃশ্যগত মিল। ১৯৪৫ সালের পারমাণবিক বোমা হামলার পর আমেরিকান আলোকচিত্রী ও সাবেক মার্কিন সেনা কর্মকর্তা জো ও’ডনেল জাপানে যুদ্ধের ভয়াবহতার বিভিন্ন দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করেছিলেন। তাঁর তোলা একটি বিখ্যাত ছবিতে দেখা যায়, এক কিশোর তার মৃত ছোট ভাইকে পিঠে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শিশুটির মুখে ছিল দৃঢ়তা, আর চারপাশে ছিল যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ।

পরবর্তী সময়ে ছবিটি যুদ্ধের নির্মমতা ও মানবিক বিপর্যয়ের অন্যতম প্রতীক হয়ে ওঠে। জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতেও একটি শিশুর অসহায় দায়িত্ববোধ ও বেঁচে থাকার সংগ্রাম ছবিটিকে বিশেষ তাৎপর্য দেয়।

নেপালের ভাইরাল ভিডিওতে থাকা শিশুটির পরিস্থিতি অবশ্য সেই ঐতিহাসিক ছবির সঙ্গে এক নয়। নাগাসাকির ছবিতে শিশুটির পিঠে ছিল মৃত ছোট ভাই, আর নেপালের ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে জীবিত দুধের শিশুকে। তবে দুই দৃশ্যের মধ্যে একটি গভীর মানবিক মিল রয়েছে-দুর্যোগের মধ্যে অল্প বয়সী একটি শিশু নিজের ছোট ভাই-বোনকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। আর সেই কারণেই অনেকের মনে পুরোনো সেই ছবির স্মৃতি ফিরে এসেছে।

‘গ্রেভ অব দ্য ফায়ারফ্লাইস’-এর কথাও মনে করছেন অনেকে

ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে জাপানের বিখ্যাত অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র ‘গ্রেভ অব দ্য ফায়ারফ্লাইস’-এর কথাও উল্লেখ করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে ভাই সেতা ও তার ছোট বোন সেতসুকোর বেঁচে থাকার সংগ্রাম ও যুদ্ধের নির্মমতার গল্প তুলে ধরা হয়েছে।

চলচ্চিত্রটির অন্যতম প্রধান বিষয় হলো-যুদ্ধ ও বিপর্যয়ের সময় শিশুদের জীবনে নেমে আসা অসহায়ত্ব এবং একে অপরকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার চেষ্টা। নেপালের ভিডিওতে দেখা দুই শিশুর দৃশ্যের সঙ্গে সেই গল্পের আবেগগত মিল খুঁজে পেয়েছেন অনেকেই।

একদিকে ভিডিওটির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও, অন্যদিকে দৃশ্যটি যে মানুষের মনে গভীর আবেগ তৈরি করেছে, তা স্পষ্ট। পিঠে ছোট বোনকে নিয়ে কাদামাখা পথে হাঁটা শিশুটির ক্লান্ত মুখ, চারপাশে মা-বাবাকে খুঁজে বেড়ানোর দৃশ্য এবং শিশুটির কান্না-সব মিলিয়ে এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

ভিডিওটি সত্যিই নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের কি না, তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। তবে দুর্যোগের মধ্যে একটি শিশুর এমন অসহায় পথচলার দৃশ্য যে মানুষের বিবেক ও আবেগকে নাড়া দিয়েছে, সেটিই ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।