রাজধানী
“তুমি না মরলে আমি মাহিরের হতে পারব না” ত্রিভুজ প্রেমে জাবি ছাত্রদল নেতা জোবায়েদ খুন
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের ছাত্র ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের নেতা জোবায়েদ হোসেনকে নির্মমভাবে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে এক ভয়াবহ ত্রিভুজ প্রেমের জেরে। ঘটনার মূল নায়িকা টিউশনির ছাত্রী বার্জিস শাবনাম বর্ষা, যিনি নিজেই পরিকল্পনা করেন জুবায়েদকে হত্যার। পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য— হত্যার মূল প্ররোচনাও এসেছে তার কাছ থেকেই।
ডিএমপির লালবাগ জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার মল্লিক আহসান উদ্দিন সামী জানান, ছুরিকাঘাতের পরও তখন বেঁচে ছিলেন জোবায়েদ। প্রাণ বাঁচাতে তিনি দোতলার দরজায় গিয়ে কড়া নাড়েন, কিন্তু কেউ সাড়া দেননি। এরপর তিনি দুর্বল দেহে তিনতলায় ওঠেন। সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন বর্ষা— নিজের হাতে তৈরি মৃত্যুকাহিনির পরিণতি দেখতে।
শেষবারের মতো জোবায়েদ তাকে অনুরোধ করেন, “আমাকে বাঁচাও।”
তবে বর্ষার ঠান্ডা উত্তর ছিল— “তুমি না মরলে আমি মাহিরের হতে পারব না।”
এরপরই ধীরে ধীরে নিভে যায় তরুণ ছাত্রনেতার প্রাণ।
মঙ্গলবার (২১ অক্টোবর) ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম জানান, জুবায়েদ হত্যার নেপথ্যে রয়েছে প্রেম, প্রতিশোধ ও ঈর্ষা। বর্ষার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে ছিলেন এক সময়ের প্রেমিক মাহির রহমান। কিন্তু পরে বর্ষার সঙ্গে পরিচয় হয় জোবায়েদের। তার ব্যক্তিত্ব ও আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে বর্ষা জোবায়েদের প্রেমে পড়েন এবং মাহিরের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন।
তবে মাহির বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি। ২৬ সেপ্টেম্বর মাহির জানতে পারেন বর্ষা এখন জোবায়েদের সঙ্গে সম্পর্ক করছেন। এর পর থেকেই শুরু হয় প্রতিশোধ ও হত্যার পরিকল্পনা। বর্ষা আবারও মাহিরের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানান— জোবায়েদকে সরিয়ে দিলেই সে মাহিরের কাছে ফিরে আসবে।
পুলিশ জানায়, এরপর বর্ষা, মাহির ও মাহিরের দুই বন্ধু— ফারদিন আহমেদ ও আইলান মিলে তৈরি করে খুনের নীলনকশা। গত রোববার বিকেলে বর্ষার বাসায় টিউশনে যাওয়ার পথে মাহিরের সঙ্গে দেখা হয় জোবায়েদের। সেখানে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে পরিকল্পিতভাবে ছুরিকাঘাত করা হয় তাকে।
নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়তেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। সোমবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত হয় জোবায়েদের প্রথম জানাজা, পরে তার মরদেহ কুমিল্লার গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়।
বিকেলে হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবিতে বংশাল থানার সামনে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাঁরা তাঁতীবাজার মোড় অবরোধ করে রেখে ঘন্টাব্যাপী আন্দোলন চালান।
ডিএমপি জানায়, ঘটনার রাতেই পুলিশ বার্জিস শাবনম বর্ষাকে হেফাজতে নেয়। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর সোমবার রাতে আরমানিটোলার নূরবক্স লেনের নিজ বাসা থেকে পুলিশ প্রটোকলে তাকে থানায় আনা হয়। পরে অভিযান চালিয়ে মাহির রহমান এবং তার সহযোগী দুই জনকেও গ্রেফতার করে পুলিশ।
অতিরিক্ত কমিশনার নজরুল ইসলাম বলেন, “এ ঘটনায় রাজনৈতিক কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এটি নিছক এক ত্রিভুজ প্রেমের করুণ পরিণতি। ঘটনার ধরণে বরগুনার মিন্নি ও রিফাত শরীফ হত্যার ঘটনার সঙ্গে মিল পাওয়া যায়।”
নিহত জোবায়েদ হোসেন ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের পরিসংখ্যান বিভাগের ছাত্র এবং কুমিল্লা জেলা ছাত্রকল্যাণ পরিষদের সভাপতি।