সারাবিশ্ব

গাজায় একদিনে ১১০ ফিলিস্তিনি নিহত, ভয়াবহ অনাহারে মৃতের সংখ্যা বাড়ছে


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৫, ১০:৪৮ এএম

গাজায় একদিনে ১১০ ফিলিস্তিনি নিহত, ভয়াবহ অনাহারে মৃতের সংখ্যা বাড়ছে
ছবি: সংগৃহীত

অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি হামলা ও চরম খাদ্য সংকটে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১১০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে অন্তত ১০ জন অনাহারে মারা গেছেন বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসন শুরুর পর থেকে অপুষ্টিজনিত ও অনাহারে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১১ জনে। এর অধিকাংশ মৃত্যু ঘটেছে গত কয়েক সপ্তাহে। এছাড়া, গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহতদের মধ্যে অন্তত ৩৪ জন মানবিক সহায়তা নিতে আসা সাধারণ মানুষ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, চলতি বছরের শুরু থেকে মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে ২১ জনের বয়স পাঁচ বছরের নিচে। মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত প্রায় ৮০ দিন গাজায় কোনো খাদ্যসামগ্রী পৌঁছাতে পারেনি সংস্থাটি। বর্তমানে কিছু খাদ্যসামগ্রী ঢুকলেও তা চাহিদার তুলনায় অতি সামান্য।

এক যৌথ বিবৃতিতে মার্সি কর্পস, নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিল এবং রিফিউজিস ইন্টারন্যাশনালসহ ১১১টি আন্তর্জাতিক সংস্থা জানিয়েছে, “গাজায় এখন গণ-অনাহারের পরিস্থিতি বিরাজ করছে।” সীমান্তের বাইরে বিপুল পরিমাণ খাদ্য, ওষুধ ও পানি মজুদ থাকলেও, তা প্রবেশে ইসরায়েলের বাধা থাকায় গাজাবাসী বাঁচার উপকরণ পাচ্ছে না।

গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকা থেকে আল জাজিরার সংবাদদাতা তারেক আবু আজ্জুম বলেন, “এখন ক্ষুধাও বোমার মতো ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। মানুষ আর চাহিদামাফিক খাদ্য চাচ্ছে না, তারা শুধু বাঁচতে চায়।” তিনি আরও জানান, গাজার বাসিন্দারা এখন ‘ধীরে ধীরে এবং যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুর’ মধ্যে রয়েছেন— যা ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর পরিকল্পিত দুর্ভিক্ষের ফল।

২০২৪ সালের মার্চে ইসরায়েল গাজায় সব ধরনের পণ্য প্রবেশ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত গাজা হিউম্যানিটেরিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ) সামান্য পরিমাণে ত্রাণ বিতরণ শুরু করলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম এবং বিতরণ প্রক্রিয়া নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে।

জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর অভিযোগ— ইসরায়েল গাজা সীমান্তের প্রবেশ ও প্রস্থান পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে রেখে মানবিক সহায়তা কার্যত বাধাগ্রস্ত করছে। সহায়তা নিতে আসা ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালিয়ে শত শত মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।

জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির জরুরি বিভাগের পরিচালক রস স্মিথ বলেন, “গাজায় আমাদের কাজ চালিয়ে যেতে হলে কিছু ন্যূনতম নিরাপত্তা দরকার, যার মধ্যে অন্যতম— খাবার বিতরণ কেন্দ্রের আশপাশে কোনো সশস্ত্র বাহিনী না থাকা।”

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফিলিস্তিনি অঞ্চলের প্রতিনিধি রিক পিপারকর্ন বলেন, গাজায় হাসপাতালে এখন একেকটি বিশাল ট্রমা ওয়ার্ডে পরিণত হয়েছে। চিকিৎসক, শিক্ষক এমনকি সাংবাদিকরাও খাদ্য সংকটে পড়েছেন, তবুও জীবন ঝুঁকিতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

গাজার আল-শিফা হাসপাতালের আমেরিকান চিকিৎসক নুর শরাফ বলেন, “মানুষ দিনের পর দিন না খেয়ে আছে, ক্ষুধায় মারা যাচ্ছে। এমনকি চিকিৎসকরাও খাবার পাচ্ছেন না, তবুও তারা হাসপাতালে উপস্থিত থেকে রোগীদের সেবা দিচ্ছেন।”

গাজা এখন কেবল যুদ্ধক্ষেত্র নয়— এটি রূপ নিয়েছে মানবিক বিপর্যয়ের কেন্দ্রস্থলে। খাদ্য, ওষুধ ও নিরাপত্তাহীন এই অবরুদ্ধ জনপদে প্রতিদিনই বাড়ছে লাশের সারি, আর সংকটের গভীরতা ছড়িয়ে পড়ছে গোটা বিশ্বের বিবেকের কাছে।