জাতীয়
প্রবাসী ভোটে বদলাতে পারে নির্বাচনের সমীকরণ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো প্রবাস থেকে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাওয়ায় বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছে এক নতুন মাত্রা। পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী ভোটার ইতোমধ্যে নিবন্ধন করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবাসী ভোট অনেক আসনে জয়–পরাজয়ের হিসাব পাল্টে দিতে পারে এবং হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অতীতের নির্বাচনগুলোর ফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বহু সংসদীয় আসনে জয়–পরাজয়ের ব্যবধান ছিল মাত্র এক থেকে দুই হাজার ভোট, কোথাও কোথাও তারও কম। সেই বাস্তবতায় এবারের নির্বাচনে যেসব আসনে ১০ হাজারের বেশি প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন করেছেন, সেখানে এই ভোটই হয়ে উঠতে পারে ‘গেম চেঞ্জার’। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে যেখানে একাধিক শক্তিশালী প্রার্থীর মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলে আসছে, সেখানে প্রবাসী ভোটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ নিবন্ধন হয়েছে ফেনী-৩ আসনে। এখানে নিবন্ধিত প্রবাসী ভোটারের সংখ্যা ১৬ হাজার ৯৩ জন। এর পর রয়েছে চট্টগ্রাম-১৫ আসন (১৪ হাজার ৩০১), কুমিল্লা-১০ (১৩ হাজার ৯৭৭), নোয়াখালী-১ (১৩ হাজার ৬৫৮) এবং নোয়াখালী-৩ আসন (১২ হাজার ৮২৯)। এ ছাড়া ফেনী-২ আসনে ১২ হাজার ৭৯৭, কুমিল্লা-১১ আসনে ১২ হাজার ৫৮৩, সিলেট-১ আসনে ১২ হাজার ৪৫৮, কুমিল্লা-৫ আসনে ১২ হাজার ৩৭৩ এবং কুমিল্লা-৬ আসনে ১১ হাজার ৯৪৩ জন প্রবাসী ভোটার পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন। চাঁদপুর-৫ আসনে নিবন্ধন সংখ্যা ১১ হাজার ৮৫২ এবং নোয়াখালী-৫ আসনে ১১ হাজার ৬৭৫ জন।
এই পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট, দেশের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে প্রবাসীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেড়েছে। অন্যদিকে, সবচেয়ে কম নিবন্ধন হয়েছে বাগেরহাট-৩ আসনে। সেখানে পোস্টাল ভোটের জন্য নিবন্ধন করেছেন মাত্র ১ হাজার ৫৯৫ জন প্রবাসী। তবে ভোটের ব্যবধান খুব কম হলে এখানেও প্রবাসী ভোটের গুরুত্ব উপেক্ষা করার সুযোগ নেই বলে মত পর্যবেক্ষকদের।
দেশভিত্তিক নিবন্ধনের হিসাবেও চিত্রটি তাৎপর্যপূর্ণ। প্রবাসীদের মধ্যে সৌদি আরব থেকে সর্বোচ্চ ২ লাখ ৩৯ হাজার ১৮৬ জন পোস্টাল ভোটের জন্য নিবন্ধন করেছেন। দীর্ঘদিন ধরেই সৌদি আরব বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রবাসী জনশক্তির আবাসস্থল হওয়ায় এই সংখ্যাকে স্বাভাবিক বলেই মনে করা হচ্ছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মালয়েশিয়া, যেখানে নিবন্ধন করেছেন ৮৪ হাজার ২৯২ জন প্রবাসী ভোটার। তৃতীয় অবস্থানে কাতার, সেখান থেকে নিবন্ধন করেছেন ৭৬ হাজার ১৩৯ জন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রবাসীরা সাধারণত দেশের রাজনীতি ও নির্বাচনের প্রতি গভীর আগ্রহী। অনেক প্রবাসী নিয়মিত দেশের খবর রাখেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় থাকেন এবং নিজ নিজ এলাকার প্রার্থীদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সচেতন থাকেন। তবে পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থার বাস্তবায়ন, সময়মতো ব্যালট পৌঁছানো, ভোট গ্রহণ ও গণনার স্বচ্ছতা নিয়েও আলোচনা ও উদ্বেগ রয়েছে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, প্রবাসী ভোট সুষ্ঠুভাবে গ্রহণ ও গণনার জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করেছেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হলো এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণ আরও অর্থবহ হবে।
পোস্টাল ব্যালট গ্রহণ ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ডাক বিভাগ থেকে প্রাপ্ত ব্যালট গ্রহণ ও সংরক্ষণের জন্য রিটার্নিং অফিসার একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেবেন। খামের ওপর থাকা কিউআর কোড স্ক্যান করে আসনভিত্তিক নির্ধারিত ব্যালট বাক্সে সেগুলো নিরাপদে সংরক্ষণ করা হবে। কিউআর কোড ডুপ্লিকেট হিসেবে শনাক্ত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যালট বাতিল করে খাম না খুলেই আলাদা করে রাখা হবে।
গণনা কার্যক্রমের জন্য রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় বা অন্য সুবিধাজনক স্থানে আসনভিত্তিক গণনা কক্ষ প্রস্তুত করা হবে। ভোট গ্রহণের দিন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বিকাল সাড়ে ৪টার পর প্রিসাইডিং অফিসাররা নিজ নিজ আসনের পোস্টাল ব্যালট ভর্তি বাক্স রিটার্নিং অফিসারের কাছ থেকে বুঝে নেবেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যালট ফেরত নিশ্চিত করতে প্রতীক বরাদ্দের পরপরই দ্রুত ভোট দিয়ে পাঠাতে প্রবাসী ভোটারদের অনুরোধ জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
সব মিলিয়ে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রবাসী ভোট দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এক নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যোগ করেছে। ফল ঘোষণার পরই স্পষ্ট হবে, কোন কোন আসনে এই ‘উড়ে আসা’ ভোট সত্যিকার অর্থে ভাগ্য নির্ধারণী ভূমিকা রেখেছে। তবে এখনই বলা যায়, প্রবাসীদের এই অংশগ্রহণ নির্বাচনের সমীকরণে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে চলেছে।