প্রবাস
যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা শেষে দেশে ফিরতে হতে পারে বেশিরভাগ বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে!
যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখছিলেন অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এক নীতিগত পরিবর্তনে সেই স্বপ্ন এখন শঙ্কায় পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি দেশের একটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমনই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর এক নির্বাহী আদেশে ট্রাম্প প্রশাসন এইচ-১বি বা ‘দক্ষ কর্মী’ ভিসার আবেদনকারীদের ওপর ১ লাখ মার্কিন ডলার অতিরিক্ত ফি আরোপের নির্দেশ দেয়। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা হাজারো বাংলাদেশি গ্র্যাজুয়েট ও শিক্ষার্থী চাকরি পাওয়া তো দূরের কথা, এখন নিজ দেশে ফিরে আসার চিন্তায়ও পড়েছেন অনেকে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী মনিরুল ইসলাম (ছদ্মনাম) বর্তমানে একটি প্রতিষ্ঠানে ডেটা সায়েন্টিস্ট হিসেবে কর্মরত। তার অপশনাল প্র্যাকটিকাল ট্রেনিং (ওটিপি) পিরিয়ড শেষের পথে। কিন্তু এইচ-১বি ভিসার অতিরিক্ত ফি দিতে প্রতিষ্ঠানটি রাজি হবে কিনা এ নিয়ে তার দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। বছরে ৮০ হাজার ডলার বেতনে কাজ করলেও, মনিরুলের মতে, “১ লাখ ডলার ফি দিয়ে কোম্পানিটি হয়তো আমাকে রাখবে না। তার বদলে গ্রিনকার্ডধারী বা নাগরিক কাউকে নিয়োগ দিতে পারে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট তাহমিদ জামান (ছদ্মনাম) একই পরিস্থিতিতে রয়েছেন। পড়ালেখা শেষ করে চাকরির খোঁজে থাকলেও এখন তার আশঙ্কা নতুন ফি কাঠামোতে কোম্পানিগুলো বিদেশি কর্মী নিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়বে।
এইচ-১বি ভিসা হচ্ছে এমন একটি ওয়ার্ক পারমিট, যা যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা শেষে সর্বোচ্চ তিন বছর ওটিপি পিরিয়ড শেষ হওয়ার পর কোম্পানির মাধ্যমে ভিসা রূপান্তরের সুযোগ দেয়। এতে আবেদনকারীরা পরে গ্রিন কার্ডের জন্যও আবেদন করতে পারেন।
বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার জন্য যাচ্ছেন। ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে এই সংখ্যা ১৭,০৯৯, যা আগের বছরের তুলনায় ২৬% বেশি এবং বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী পাঠানো দেশগুলোর মধ্যে অষ্টম স্থানে উন্নীত করেছে।
তবে এখন এসব শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। একাধিক শিক্ষার্থী এবং গবেষক জানিয়েছেন, তথ্যপ্রযুক্তি ছাড়া অন্য খাতে চাকরি পাওয়া এখন কঠিন হয়ে পড়বে, কারণ অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ১ লাখ ডলার অতিরিক্ত ফি বহন করা সম্ভব নয়।
একজন বাংলাদেশি পোস্ট-ডক্টরাল গবেষক বলেন, “আমি ইউনিভার্সিটিতে ৯০ হাজার ডলারে চাকরি করি। এখন ১ লাখ ডলার ফি দিতে হবে, অথচ এখনও গ্রিন কার্ড পাইনি। আমার মতো অনেকেরই হয়তো যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে হবে।”
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ‘সোচ্চার’-এর প্রেসিডেন্ট ড. শিব্বির আহমদ বলেন, “বাংলাদেশ থেকে যারা এফ-১ ভিসায় যান, তারা মূলত পড়াশোনার পর ওটিপি-এর মাধ্যমে চাকরিতে যুক্ত হন। এরপর এইচ-১বি-তে রূপান্তর হয়। এখন এইচ-১বি-তে অতিরিক্ত ফি তাদের পুরো প্রক্রিয়াটাই অনিশ্চিত করে তুলছে।”
এই পরিবর্তনের ফলে শুধু বাংলাদেশি নয়, ভারতের নাগরিকরাও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মার্কিন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে এইচ-১বি ভিসার ৭১% ভারতীয়দের দখলে এবং ১২% চীনের নাগরিকদের।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন ফি কাঠামোর কারণে কোম্পানিগুলো এখন দক্ষ বিদেশি কর্মী নিতে চাইবে না। ফলে চাকরি হারানো, দেশত্যাগ বা বিকল্প পথ খোঁজার মতো সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে হাজার হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীকে।