সারাদেশ
ফুটপাতঘেঁষে ২৬ দোকান নির্মাণ, মহাসড়কের জায়গা দখলের অভিযোগ
রংপুরের মিঠাপুকুরে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের জায়গা দখল করে মার্কেট নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা পরিষদ চত্বরের প্রধান প্রবেশদ্বারসংলগ্ন এলাকায় ফুটপাতঘেঁষে ২৬টি সেমিপাকা দোকানঘর নির্মাণকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, মহাসড়কের সংরক্ষিত জায়গার কাছাকাছি এসব দোকান নির্মাণ করা হলে পথচারীদের চলাচলে বাধা সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনা ও যানজটের ঝুঁকি বাড়বে।
স্থানীয়দের দাবি, নির্মাণকাজ শুরুর আগে কোনো দরপত্র আহ্বান করা হয়নি। এমনকি এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো নোটিশও দেওয়া হয়নি। মহাসড়কের সীমানা ও সংরক্ষিত জায়গা নির্ধারণ না করে এভাবে স্থাপনা নির্মাণ করা হলে ভবিষ্যতে জায়গাটি নিয়ে বড় ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। একই সঙ্গে দ্রুত সরেজমিনে পরিমাপ করে দোকানগুলোর অবস্থান ও নির্মাণের বৈধতা স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
মঙ্গলবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলা পরিষদের প্রাচীরঘেঁষে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের পাশে নতুন করে সেমিপাকা দোকানঘর নির্মাণের কাজ চলছে। উপজেলা পরিষদের মূল ফটকের পাশেই নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখা হয়েছে। কয়েকটি দোকানের কাঠামো ইতিমধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে। দোকানগুলোর অবস্থান মহাসড়কের খুব কাছাকাছি হওয়ায় পথচারীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত এক সপ্তাহে উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ওই এলাকায় থাকা চারটি আমগাছ কেটে ফেলা হয়েছে। একই সময়ে সেখানে আগে থেকে অস্থায়ীভাবে গড়ে ওঠা কয়েকটি দোকানও ভেঙে দেওয়া হয়। এরপর ওই জায়গায় নতুন করে ২৬টি দোকানঘর নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়। তবে এসব দোকান নির্মাণের প্রক্রিয়া, বরাদ্দ ও অনুমোদন নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
দুর্গাপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারি নিয়ম না মেনে কোনো উন্নয়নকাজ করা ঠিক নয়। তবে কাজটির সঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা আছে। তিনি কীভাবে কাজটি করাচ্ছেন, তা আমি জানি না। তাই এ বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই।’
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, কয়েক বছর আগে মহাসড়ক সম্প্রসারণের সময় তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান উচ্ছেদ করা হলেও এখন একই এলাকায় নতুন করে দোকান নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে পুরোনো ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বেড়েছে।
জানা গেছে, ২০১৯ সালে ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার সময় উপজেলা পরিষদের উদ্যোগে নির্মিত শাপলা মার্কেট উচ্ছেদ করা হয়। ওই মার্কেটে ৩১ জন ব্যবসায়ী ব্যবসা করতেন। মহাসড়ক সম্প্রসারণের জন্য মার্কেটটি ভেঙে ফেলা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত এসব ব্যবসায়ীর পুনর্বাসন বা ক্ষতিপূরণের কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি বলে দাবি তাদের।
ব্যবসায়ী ওয়াজেদ আলী বলেন, ‘আমরা উপজেলা পরিষদের নির্ধারিত ফি দিয়ে শাপলা মার্কেটে ব্যবসা করতাম। মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার সময় মার্কেটটি ভেঙে ফেলা হয়। তখন আমাদের পুনর্বাসনের কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি। এখন একই জায়গায় নতুন করে দোকান নির্মাণ করা হচ্ছে। অথচ আমরা যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলাম, তাদের বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সামনে ফুটপাত থাকায় নতুন দোকান বসলে পথচারীদের চলাচল বাধাগ্রস্ত হবে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়বে।’
আরেক ব্যবসায়ী মাহফুজার রহমান বলেন, ‘এখানে মার্কেট নির্মাণের কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা আমাদের চোখে পড়ছে না। দোকানগুলো মহাসড়কের সংরক্ষিত জায়গার খুব কাছাকাছি করা হচ্ছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরিষ্কার করা উচিত।’
ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘যে জায়গায় দোকান নির্মাণ করা হচ্ছে, সেটি মহাসড়কের অংশ বলেই আমরা জানি। আগে এখানে শাপলা মার্কেট ছিল। মহাসড়ক সম্প্রসারণের সময় সেটি উচ্ছেদ করা হয়েছে। এখন আবার একই এলাকায় দোকান নির্মাণ করা হলে জায়গাটির প্রকৃত মালিকানা ও সীমানা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।’
কৃষ্ণপুর গ্রামের বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, ‘এটি ব্যস্ত মহাসড়ক। এখানে যদি দোকান বসে যায় এবং মানুষ কেনাকাটা করতে এসে মহাসড়কের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে পথচারীদের রাস্তা ব্যবহার করতে হতে পারে। এতে দুর্ঘটনা ও যানজট—দুটোরই আশঙ্কা বাড়বে।’
তবে মহাসড়কের জায়গা দখল করে দোকান নির্মাণের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. পারভেজ। তিনি বলেন, ‘মহাসড়কের পাশে মানুষের চলাচলের জায়গা দখল করা হয়নি। সাসেক প্রকল্পের আওতায় যে ফুটপাত নির্মাণ করা হয়েছে, তার ওপর কোনো কাজ করা হচ্ছে না। ফুটপাত ছেড়ে উপজেলা পরিষদের নিজস্ব হলরুমসংলগ্ন জায়গায় অস্থায়ী দোকান নির্মাণ করা হচ্ছে।’
নির্মাণকাজ শুরুর আগে দরপত্র আহ্বান না করার বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ‘এটি ব্যক্তিগত কোনো সিদ্ধান্ত নয়। জনপ্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে উন্মুক্ত ফোরামের সভায় আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে একটি কমিটি করা হয়েছে এবং রেজুলেশনও হয়েছে।’
মার্কেট নির্মাণ প্রকল্প কমিটির সভাপতি উপজেলা জনস্বাস্থ্য উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিতে আর কাদের রাখা হয়েছে, তা আমি জানি না। কাজ চলছে। আমি কাজটি দেখাশোনা করছি। এখন পর্যন্ত কোনো সমস্যা হচ্ছে না।’
তবে রংপুর সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে সরেজমিনে পরিদর্শন করা হবে। তিনি বলেন, ‘উপজেলা পরিষদের হলরুমের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জায়গা চার লেনের মহাসড়কের মধ্যে পড়েছে। সেখানে সীমানা পিলারও দেওয়া হয়েছে। সড়কের সংরক্ষিত জায়গা দখল করে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা আইনসম্মত নয়। বিষয়টি সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যে নতুন করে নির্মাণাধীন ২৬টি দোকানের অবস্থান, নির্মাণপ্রক্রিয়া ও অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে মহাসড়কের সীমানা ও ফুটপাতের প্রকৃত অবস্থান সরেজমিনে পরিমাপ করে বিষয়টি পরিষ্কার করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের আশঙ্কা, নির্মাণকাজ শেষ হয়ে দোকানগুলো চালু হলে ব্যস্ত মহাসড়কের পাশে জনসমাগম বাড়বে এবং এতে পথচারী ও যানবাহনের চলাচলে নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সূত্র: সমকাল