আইন আদালত

শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলার রায় ১৭ নভেম্বর


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ নভেম্বর ২০২৫, ১২:২১ পিএম

শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলার রায় ১৭ নভেম্বর
শেখ হাসিনা। ছবি: সংগৃহীত

জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করা হবে আগামী সোমবার, ১৭ নভেম্বর।

বৃহস্পতিবার (১৩ নভেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ দিন নির্ধারণ করেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারপতি মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

এই মামলার অন্য দুই আসামি হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এবং সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়। পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রথম মামলাটি হয় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে। একই বছরের ১৭ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল প্রথম শুনানি অনুষ্ঠিত করে এবং শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে।

পরবর্তীতে, চলতি বছরের ১৬ মার্চ সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে এ মামলার আসামি হিসেবে যুক্ত করা হয়।

মামলার তদন্ত প্রতিবেদন গত ১২ মে জমা দেয় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। ৮ হাজার ৭৪৭ পৃষ্ঠার বিশাল এ প্রতিবেদনে রয়েছে ২ হাজার ১৮ পৃষ্ঠার তথ্যসূত্র, ৪ হাজার পাঁচ পৃষ্ঠার দালিলিক প্রমাণ এবং ২ হাজার ৭২৪ পৃষ্ঠার শহীদদের তালিকা।

এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ১ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান ও আবদুল্লাহ আল-মামুনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। সেদিনই ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ আমলে নেয় এবং ১০ জুলাই তিনজনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেয়।

পরে সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন দোষ স্বীকার করে রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদন করেন, যা ট্রাইব্যুনাল মঞ্জুর করে। তিনি পরবর্তীতে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হিসেবে আদালতে সাক্ষ্য দেন।

গত ২৩ অক্টোবর মামলার চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। তিনি শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানের সর্বোচ্চ শাস্তি (মৃত্যুদণ্ড) দাবি করেন। একই দাবি করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।

অন্যদিকে, রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানের খালাস প্রার্থনা করেন।

এরপর ট্রাইব্যুনাল জানায়, রায়ের তারিখ ১৩ নভেম্বর ঘোষণা করা হবে—যা পরবর্তীতে নির্ধারিত হয়েছে আগামী ১৭ নভেম্বর।

প্রথম অভিযোগ: ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ ও ‘রাজাকারের নাতি-নাতনি’ বলে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ও আইজিপি মামুনের নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আওয়ামী কর্মীরা নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর হামলা চালায়। গুলিতে প্রাণ হারান প্রায় দেড় হাজার মানুষ এবং আহত হন ২৫ হাজারের বেশি।

দ্বিতীয় অভিযোগ: শেখ হাসিনা আন্দোলন দমন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রাণঘাতী অস্ত্র, হেলিকপ্টার ও ড্রোন ব্যবহারের নির্দেশ দেন। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপি সেই নির্দেশ বাস্তবায়ন করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এএসএম মাকসুদ কামাল ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ফজলে নূর তাপসের সঙ্গে হাসিনার কথোপকথনের অডিও রেকর্ড থেকে বিষয়টি নিশ্চিত হয়।

তৃতীয় অভিযোগ: রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান ও আবদুল্লাহ আল-মামুনকে অভিযুক্ত করা হয়।

চতুর্থ অভিযোগ: রাজধানীর চানখাঁরপুলে আন্দোলনরত ছয় নিরীহ নাগরিককে গুলি করে হত্যার অভিযোগও তাদের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে।

পঞ্চম অভিযোগ: আশুলিয়ায় ছয়জন আন্দোলনকারীকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায়ও তিন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।

প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম বলেন, “আমরা আশা করি রায়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানের মৃত্যুদণ্ড হবে। তবে রাজসাক্ষী মামুনের ভাগ্যে কী ঘটবে, তা আদালতই নির্ধারণ করবেন।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ দেশ-বিদেশে এ বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। তবে ট্রাইব্যুনাল কোনো প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার করবে না বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

দীর্ঘ শুনানি, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও যুক্তিতর্ক শেষে আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণার দিন নির্ধারিত হয়েছে ১৭ নভেম্বর। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন চূড়ান্ত রায় ঘিরে চলছে ব্যাপক আলোচনার ঝড়।