সারাদেশ

দিনাজপুরে একই পরিবারে দুই প্রতিবন্ধী সন্তান, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের মানবেতর জীবনযাপন


নিজস্ব প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৫, ০৩:৩৭ পিএম

দিনাজপুরে একই পরিবারে দুই প্রতিবন্ধী সন্তান, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের মানবেতর জীবনযাপন
ছবি: ঢাকাপ্রকাশ

দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার গোয়ালডিহি ইউনিয়নের দুবলিয়া হঠাৎ পাড়া গ্রামের বাসিন্দা মো. আশরাফ আলী (৭৬) ও তাঁর স্ত্রী মোছা. আলেয়া বেগম (৬০) চরম দারিদ্র্যের মধ্যে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।

তাঁদের সংসারে রয়েছে দুই প্রতিবন্ধী সন্তান—মো. আনোয়ার হোসেন (৩৫) ও মো. আক্কাস আলী (৩২)। শারীরিক ও মানসিকভাবে সম্পূর্ণ অক্ষম এই দুই ভাই সারাদিন বিছানাতেই পড়ে থাকেন, চলাফেরা তো দূরের কথা, নিজের খেয়াল রাখারও সামর্থ্য নেই।

পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস প্রতিবন্ধী ভাতা এবং বৃদ্ধ মা-বাবার কঠিন পরিশ্রম। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়েও মোছা. আলেয়া বেগম অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে সামান্য যা আয় করেন, তা দিয়েই কোনোমতে চলে তাঁদের চারজনের খরচ। প্রয়োজন হলে মানুষের কাছে সাহায্য চাইতেও বাধ্য হন তিনি।

পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আশরাফ আলীর চার ছেলের মধ্যে বড় ছেলে আলম আলী স্ত্রী-সন্তান নিয়ে আলাদা থাকেন। তাঁদের একজন ছেলে বহু আগেই মারা গেছেন। ফলে বর্তমানে এই অসহায় দম্পতির জীবনের পুরোটা জুড়েই দুই প্রতিবন্ধী সন্তানের সেবা-শুশ্রূষা ও বেঁচে থাকার লড়াই।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, মানুষের দানকৃত একখণ্ড জমিতে নির্মিত জরাজীর্ণ ঘরেই বসবাস করেন তাঁরা। ঘরের এক কোণে প্রতিবন্ধী দুই ছেলে চুপচাপ শুয়ে আছে। অপর কোণে মা মোছা. আলেয়া বেগম তাদের গোসল করানো, খাওয়ানো, জামা বদলানোসহ সব ধরনের পরিচর্যায় ব্যস্ত। ঘরের ভেতরেই বৃদ্ধ আশরাফ আলী সময় কাটান স্ত্রীর কাজে সহযোগিতা করে।

মোছা. আলেয়া বেগম বলেন, “স্বামী ও দুই প্রতিবন্ধী সন্তান নিয়ে জীবনের অনেকটা পথ পার করেছি কষ্টে। দিন যায়, কিন্তু দুশ্চিন্তা কাটে না। কখনো কখনো খেতে পারি, কখনো পারি না। মানুষের সহানুভূতি ছাড়া কিছুই চলে না। যদি কেউ বড় করে সাহায্য করত, তাহলে দুই ছেলেকে একটু ভালোভাবে বাঁচিয়ে রাখতে পারতাম।”

দুই প্রতিবন্ধী ছেলের বড় ভাই আলম আলী জানান, “আমি নিজেই দরিদ্র। নিজ পরিবার নিয়ে কোনোমতে চলি। তারপরও যতটা পারি বাবা-মা ও ভাইদের সহায়তা করি। তবে ওদের চিকিৎসা বা নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। সরকার বা বেসরকারি সংস্থাগুলোর সহায়তা না পেলে তাঁদের জীবন বাঁচানো কঠিন।”

এ বিষয়ে গোয়ালডিহি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাখাওয়াত হোসেন লিটন বলেন, “পরিবারটির দুর্দশার কথা আমি জানি। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে যতটা সম্ভব সহায়তা করা হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি ও নিয়মিত সহযোগিতা ছাড়া এ পরিবারটি চলতে পারবে না।”

উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা তমিজুল ইসলাম জানান, “প্রতিবন্ধী দুই ভাইকে ইতোমধ্যে সরকারি প্রতিবন্ধী ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। তবে পরিবারের সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে তাঁদের জন্য বিশেষ সহযোগিতা কিংবা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) সঙ্গে পরামর্শ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”

এই ধরনের পরিবারগুলোর পাশে সমাজের বিত্তবান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাঁড়ানো অত্যন্ত জরুরি—এমনটাই মনে করছেন স্থানীয়রা। রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা আরও সম্প্রসারিত হলে প্রতিবন্ধী ও দারিদ্র্যপীড়িত পরিবারগুলোর জীবনমান কিছুটা হলেও উন্নত হতে পারে।